নব্বই দশকের সাদামাটা, স্নিগ্ধ এক রমণী সূচনা। মা হারানো এই মেয়েটি, স্নিগ্ধ হলেও বেরঙীন, উদাসী প্রহেলিকা। মানুষ যখন তাকে অসুন্দর বলে হেয় করতো, পরিবার, স্বজন ও সমাজ অবহেলা করতো, এসব সে গায়ে মাখত না। তার নিজস্ব এক জগৎ রয়েছে প্রকৃতির মাঝে—সেখানে তার সমস্ত ধ্যান, জ্ঞান ও শান্তি। কিন্তু হঠাৎ তার এই নিজস্ব জগৎ, পরিচিত এই শহরে—ধুমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির আগমন ঘটে অপ্রিয়, অপছন্দনীয় একজন সায়েন্টিস্ট। অপছন্দনীয় সায়েন্টিস্ট সাহেব কি পারবে প্রহেলিকা নামক কদমফুলকে তার করতে?
প্রহেলিকা
অপ্রিয় সায়েন্টিস্ট সাহেব, চিঠির শুরুতে অপ্রিয় সম্ভোধন করায় রেগে যাননি তো? মেঘমেদুর দিনে মুষলধারে বৃষ্টির মাঝে , আকাশে ঝিলিক দিয়ে ওঠা অমর্ষ ক্রোধে ফেটে পড়া বজ্রপাতের ন্যায় আপনার হৃদয় কাঁপেনি, তা আমি জানি বটে! আপনি আমার একান্ত, নিজস্ব অপ্রিয় প্রিয়জন। যে প্রিয়জন হয়েও অপ্রিয়জনের সারিতে যার নামটাই প্রথম। আপনি কি জানেন? আমার দুঃখরা সব নিজস্ব! এই দুঃখতে কারো ভাগ হতে নেই। এই যে এত বড় পৃথিবীতে আমি বড্ড একা অনুভব করছি।এত কোলাহল, এত মানুষ, তবুও আমি একা। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়,মনটা বিষন্নতায় ছেঁয়ে যায়। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। কল্পনায় ডুবে যেতে মন চায়! ঐযে ছেলেবেলায় যেমন কল্পনা করতাম ঠিক সেরকম। বৃষ্টি হলে তাতা থৈ থৈ করে নেচে, গেয়ে ঘুরে ফিরতাম, কুয়াশামাখা ভোরে উঠে খালি পায়ে শিশির ভেজা ঘাসে আলতো পায়ে হেঁটে চলতাম ঠিক তেমন! জানেন সায়েন্টিস্ট সাহেব! আপনাকে বড্ড মনে পড়ে। এক অসহ্য ব্যাপার ঘটেছে। আপনি দিনে দুপুরে আমার কল্পনায় এসে বড্ড সুন্দর হানা দেন! উহুম! এটা মোটেও পছন্দ নয় আমার। এতসব কিছু পারেন কিভাবে আপনি? ভাবছেন অভিযোগ করছি আপনায়? তা ঠিক বটে! তবে আপনি বোধহয় এমন এক ব্যক্তি যে আমাকে আড়ালে আবডালে যত্ন করে, ভালোবাসে। যে আমার সকল,ভালোলাগা, খারাপলাগা জানে।সে জানে আমি কি চাই! আমার কখন কি দরকার! আচ্ছা বলুন তো,কেন এতো ভালোবাসেন আমায়? কেউ তো এতো ভালোবাসে না, তাহলে কিসের এতো মায়া আমার প্রতি? মাঝে মাঝে বড্ড অবাক হয়ে যাই আমার প্রতি আপনার এতো ভালোবাসা দেখে। জানেন বিজ্ঞানি সাহেব! ভয় হয়, খুব ভয় হয়! হারিয়ে ফেলার ভয়, কারণ আমার খালি মানুষ হারায়। ঝুমঝুম বৃষ্টির পর আকাশে রংধনুর ন্যায় আপনি যদি কখনও মিলিয়ে যান? তাহলে কি নিয়ে বাঁচবো আমি ? কি আশ্চর্য ! আমার বিয়ে হয়েছে আপনার সাথে অথচ আমি আজও তা বিশ্বাস করেই উঠতে পারলাম না! আমার মতো নব্বই দশকের ভাঙাচোরা এক সাদাসিধা মেয়েকে এতই আপন করে নিলেন? কেন? কখনও জানতে চাইবো না এমনকি আজও নয়। আমি বড্ড অভিমানী মানুষ, অভিমান করতে ভালোবাসি,কিন্তু এই পৃথিবীতে নিজের অভিমান বোঝার মত কেউ কখনও ছিল না। কিন্তু কেন জানি না, হুট করেই আপনি আসার পর সব পাল্টে গেল। পাল্টে গেল আমার সেই চিরচেনা পরিবেশ এবং ভাঙাচোরা সেই আমিটা! আমি জানি, আপনি হয়তো আমার সব অনুভূতি একসাথে বোঝার চেষ্টা করবেন না।কিন্তু তাই ঠিক আছে। আমি চাই না, কেউ আমার সবটা বুঝুক।কিছু অনুভূতি শুধু নিজের! কিছু আবেগ শুধু লিখে রাখার জন্য। আর কিছু অনুভূতি শুধু বুকে লুকোবার জন্য। আজও ভয় লাগে—ভয় যে এই সম্পর্কটা এত সহজ নয়। আমাকে বুঝতে পারা বড্ড কঠিন! কিন্তু আশ্চর্য! আপনি সেই জিনিসটি করতে পেরেছেন। এই যে লিখতে লিখতেই অজান্তেই আপনার প্রতি একরাশ ভালোলাগা মনটা ছুঁয়ে গেল। আপনি হাসবেন, নরম কণ্ঠে বলবেন—“ সূচনা ,আপনি সবকিছু অত্যন্ত জটিল করে ভেবে দেখেন\" হয়তো ঠিকই বলছেন।কিন্তু আমি ভয় পেয়েই লিখছি। ভয় পেয়ে নিজের অভিমান, নিজের ভালোবাসা, নিজের ক্ষোভ একসাথে রাখতে চাচ্ছি। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি আমাকে এই চিঠি লিখতে বাধ্য করছে। আপনি যদি সত্যিই আমাকে কদমফুল আপনার বানাতে চান তাহলে শুনুন, এটা কোনো সহজ পথ নয়। প্রতিটি ঝড়, প্রতিটি বৃষ্টির মতো মুহূর্ত, প্রতিটি কল্পনার মতো আবেগ সবই পরীক্ষা। আমার সবই আপনাকে সহ্য করতে হবে।এবং আমি জানি,তা আপনি পারবেন। আপনি আমার জীবনের অদ্ভুত, অবাক করা অংশ। যে মানুষ আমার ভাঙাচোরা জীবনের সবটুকু আঁকড়ে ধরে, যে মানুষ আমার একাকিত্বে, আমার আবেগে, আমার দুঃখে প্রতিফলিত হয়।আপনি সেই মানুষ। আর এটাই সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ আমার জীবনে। চিঠি শেষ করতে যেতে যেতেই মনে হয়— আমি কি লিখলাম, কি বাকি রাখলাম, তা কি আপনি বুঝবেন? তবুও লিখলাম। কারণ কিছু অনুভূতি কখনও বলা যায় না,শুধু লেখা যায়। শুধু বুকে বেঁধে রাখা যায়।আপনার প্রতি, সব ভাঙা, সব অভিমানী, সব ভালোবাসা একত্রিত করলাম। আলতো হাতে, যত্নে তা আপনি আগলে রাখবেন। ইতি প্রহেলিকাময় সূচনা চিঠিটা শেষ করে সূচনা ধীরে কলমটা নামিয়ে রাখল। কাগজের ওপর কালির দাগ শুকোচ্ছে, কিন্তু তার বুকের ভেতর জমে থাকা অনুভূতিগুলো শুকোয় না কখনও। রঙচটা জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে। আকাশটা ধূসর ঠিক তার মনের মতো! কদমফুলের গাছটা বাতাসে হালকা দুলছে, যেন সে-ও কিছু বলতে চায়, অথচ বলতে পারে না।সূচনা জানে, এই চিঠি হয়তো কখনও আহিয়ানের হাতে পৌঁছাবে না। কিন্তু তবুও সে লিখেছে। কারণ কিছু কথা বলা হয় না।লিখে ফেলতে হয়।কিছু অনুভূতি কাউকে দেওয়ার জন্য নয়, নিজের বোঝা হালকা করার জন্য। সূচনা চিঠিটা ভাঁজ করল না। ভাঁজ করলে যেন অনুভূতিগুলো ভেঙে যাবে এই ভয়ে। চুপচাপ খাতার ভেতরে রেখে দিল, ঠিক যেমন সে নিজের অভিমানগুলো বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে। আহিয়ান কি কখনও জানবে? সে যখন সূচনার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে,যখন কিছু না বলেও সে সব বুঝে নেয়, ঠিক তখনই সূচনার সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে? সূচনা জানে, সে সহজ মানুষ নয়।সে হাসে কম, ভাবে বেশি। সে চিৎকার করে কাঁদে না,ভেতরে ভেতরে ভেঙে যায়। কিন্তু আহিয়ানের সামনে এসে সে প্রথমবার নিজের ভাঙাচোরা অংশগুলো লুকোতে চায় না।এইটুকুই তার অপরাধ! ঘরের ভেতর আলো জ্বলে ওঠে। সূচনা উঠে দাঁড়ায়। চুলের খোঁপাটা একটু আলগা করে,আয়নায় নিজের দিকে তাকায় সূচনা। তার এই শ্যামবর্ণ চেহারা, নিতান্ত সাধারণ জীবনাচরণের জন্য তাকে সবাই অপছন্দ করে। মা হারানো নব্বই দশকের সাদাসিধে এই মেয়েটা—আজও বিশ্বাস করতে পারে না,কেউ তাকে এতটা আপন করে নিতে পারে। ★ বাইরে বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। ঝুমঝুম শব্দে। সূচনা বাতায়নের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঝড়ো হাওয়ায় গাছপালা দুলছে। টিনের চালে বৃষ্টির ফোটা মৃদু ছন্দ তুলেছে। ঝড়ো হাওয়া শো শো শব্দ করে বইছে। বৃষ্টির ফোটা তার গায়েও লাগছে। সূচনা হাতটা বাড়িয়ে দিলো। বিরবির করে সে রবের নিকট তার গোপন আর্জি জানালো। মাঝে মাঝে গগন চিরে ঝিলিক দিচ্ছে সাথে তার মনটাও। মনে মনে শুধু তার একটাই প্রশ্ন ঘোরে— অপ্রিয় সায়েন্টিস্ট সাহেব, আপনি যদি সত্যিই আপনার কদমফুল বানাতে চান, তাহলে কি আমার এই নীরব ঝড়গুলোও আগলে রাখতে পারবেন?
0 Comments