“মুখোশের আড়ালে” একটি দ্বীনি চেতনা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সমাজের লুকানো মুখ উন্মোচনের গল্প। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৭ বছর বয়সী ইফরা আরশি—একটি সাধারণ, পর্দানশীন, আল্লাহভীরু মেয়ে, যে ঝালকাঠির আধা-গ্রাম আধা-শহর পরিবেশে বড় হচ্ছে। তার পরিবার ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী; মা আরও ফাতিহা একজন ধৈর্যশীলা ও সচেতন নারী, যিনি মেয়েকে বন্ধুর মতো আগলে রাখেন এবং দ্বীনের পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করেন।
মুখোশের আড়ালে (পর্ব -২)
#লেখিকা_সানজিদা_আফরিন _________________________________ ইফরা কতক্ষণ টেবিলে বই নাড়াচাড়া করে উঠে গেল। তার আবার পড়াশোনা ভালো লাগেনা, মনে মনে খুব অসন্তুষ্ট কোন মদনে জানি, এ পড়ালেখা আবিষ্কার করছে হুদাই ফাউল লোক কোথাকার, তারপর টুক করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল তার মায়ের রুমে গেল, তার মা বলল এত তাড়াতাড়ি পড়া শেষ, আপনার ? তার মায়ের আবার একটা রোগ আছে, সাধারণভাবে কথা বললে তুই করে বলবে, আদর করলে তুমি বলবে, রাগ ও অভিমান করে থাকলে আপনি বলবে, সে সাথে সাথে গিয়ে তার মাকে জড়িয়ে ধরল এবং কপালে একটি ভালোবাসার স্পর্শ দিল, উফ আম্মিজান আপনি আজকাল খুব সুন্দর হয়ে যাচ্ছেন কি যে ভালো লাগে আপনাকে দেখলে মন চায় শুধু তাকেই থাকতে, রিয়াদ আহমেদ তো এখন মনে হয় মনে মনে পাগল হয়ে যাইতেছে, আরো ফাতিহা আর মেয়ের দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, মেয়েটা কতটা বদমাশ হইলো, মা-বাবাকে নিয়ে এরকম কথা বলতে পারে, এইতো লজ্জা শরম নেই আমি তোর মা আর তোর মার সামনে এসব কথা বলছিস, ওমা আমার লজ্জা শরম থাকবে না কেন ? লজ্জা তো নারীর ভূষণ ।আমাকে কি নারি মনে হয় না তোমার? আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ আম্মি আল্লাহ পাপ দিবে, এইসব কথা বলে না! এবার আর তারা আম্মি রাগ করে থাকতে পারলেন না হুট করে হেসে ফেললেন, আমি বুঝলাম না তোর এত নাটক করা লাগবে কেন এত নাটক করে রাগাস আবার এত নাটক করে রাগ ভাঙ্গাস কেন? আজকে যদি তোমার রাগ না ভাঙ্গাতাম তাহলে সারারাত আমি ঘুমাতে পারতাম না ছটফট করতাম, তারপর তিনি তার মেয়েকে নিয়ে খাটে বসলেন এবং মেয়েকে ফ্লোরে বসালেন, ইসরা বুঝে গিয়েছে এখন তাকে তার মা মাথায় তেল দিয়ে দিবে, মা আবার তেল দিবে আমার একটুও ভালো লাগে না, কিরকম মাথা চুপচুপ হয়ে থাকে তেলে, তার মেয়েটাও না এই তেল দিতে চায়না, দেখতো তোর চুলগুলো কি অবস্থা করেছিস তেল না দিতে দিতে? ঠিক আছে আমি দিব কিন্তু তোমাকে তোমার মোবাইল দিতে হবে আমার কাছে বলে একটি হাসি দিল, ও তোর মনে এই ছিল, তিনি বুঝেছেন তার আর কোন উপায় নেই তাই তিনি তার মোবাইলটা তার মেয়েকে দিয়ে নিচে বসিয়ে তেল নিয়ে তেল দিতে লাগলেন তার মেয়ের মাথায়, ইফরা মোবাইলে ঢুকেই প্রথমে whatsapp এ গিয়ে তাদের গ্রুপে মেসেজ দিল, আসসালামু আলাইকুম , কি খবর তোদের ? ফারিয়া নামের একজন বলল, ওই যে এসে গেছে আমাদের হুজুরনি বান্ধবী, বললেই সবাই হাসাহাসি করতে লাগলো, শুধু একজন ছাড়া, সে আর কেউ না ইফরার বেস্ট ফ্রেন্ড নূর এই তোরা থামবি, তোরা যেরকম ওকে একবার সেটা বলেছে একেকজনের ব্যক্তিত্ব বলতে কিছু আছে? ও যেরকম থাকতে পছন্দ করো ওই রকমই থাকে এটা নিয়ে হাসাহাসি করা ঠিক না। ইয়াফা বলল, হইছে আর তোমার তোমার বান্ধবীর লাইগা সাফাই গাইতে হবে না। ফারিহা বলল ভাই আজকে আমরা ঘুরতে গেছি সবাই ছবি তুলছি খাওয়া-দাওয়া করছি আর ইনি তো তার মুখুসি খুলিনি, আশ্চর্য, তোর রূপ কি? দেখে মানুষ পাগল হয়ে যাবে নাকি, যেনা চেহারা আবার বড় বড় কথা, বলে একটা মুখ বেঞ্চির ইমোজি পাঠালো, ইফরা শুধু সব দেখে গেল কিছু লিখল না আর, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্য ধারণকারীদের ভালবাসেন? তার মেয়েকে মন খারাপ করে মোবাইলে দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললেন কি হয়েছে তোর? আচ্ছা মা ওরা কত বোকা? তাই না? আমি পর্দা করি বলে ওরা আমাকে নিয়ে মজা করে হাসাহাসি করে, অথচ ওরা বোঝেনা আমি নিজেকে দামি মনে করি বলে, নিজেকে প্যাকেট করে রাখি, হয়তো আল্লাহ আমাকে এত রুপ দেয়নি ওদের মতো, শ্যাম বর্ণের আমি, তবুও আমি সন্তুষ্ট যখন আমার চেয়ে কালো কাউকে দেখি আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা হয়তো পরীক্ষা শুরু আলহামদুলিল্লাহ, অথচ ওরা নিজেদেরকে কত কম দামি করে ফেলছে নিজেকে প্রকাশ করে সবাই ওদের সৌন্দর্য দেখে আর মাছির মত চারপাশে ঘুরঘুর করে, জানো মা আজকে কি হয়েছে ? আরো ফাতিহা তার মেয়ের দিকে আগ্রহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, আজকে যখন ঘুরতে যাচ্ছিলাম সবাই মিলে, একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম, তুই ওখানে অনেক লোক ছিল তো ওইখানে খাবার অর্ডার দিল তো আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি কি খাব? আমি বললাম আমি খাব না তোরা খা, তারপর তারা কারন জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম এখানে অনেক পুরুষ মানুষ আছে আমি নিকআপ খুলতে পারবো না, এটা নিয়ে তারা অনেক হাসাহাসি করেছি, আমি বললাম, আমি আমার মাহরাম ছাড়া কাউকে দেখতে দিব না, তারা বলল, আমার এই রূপ নিয়ে এত নাটক না জানি একটু সুন্দর হলে আমি কি করতাম? জানো মা তখন আমার অনেক খারাপ লেগেছিল আর নূর ও কিছু বলেনি চুপচাপ থেকে ছিল কি আর বলবে কথা বললে কথা বাড়বে, ইফরা মায়ের পায়ের কাছে গিয়ে কান্না ভেজা চোখে বলতে শুরু করলো, মানুষ সত্যি করে বলছি, আমি আমার রূপ নিয়ে কোন অহংকার করিনি তো করিনি আমার এই শরীরটা তো আল্লাহর আমানত, আমি তো তা শুধু রক্ষা করেছি, আরো ফাতিহা তার মেয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সে ভেবেছিল তার মেয়ে কত বোকা আসলে তার মেয়ে তো অনেক জ্ঞানী, আলহামদুলিল্লাহ। যে মেয়ের লম্বা চুলগুলো বেনুনী করতে করতে বলে উঠলো, তুমি কেমন তার শুধু তোমার রব জানেন ।তোমার মনের এবং বাহিরের খবর সব তো তোমার রব জানে! তাহলে মানুষের কথায় কেন নিজেকে কষ্ট দিবে ?তোমার রব তোমাকে বোঝেন বোকা মেয়ে যাও এছাড়া নামাজ পড়ে এসো তারপর তোমার বাবা ও চলে আসবে একসাথে সবাই খাওয়া দাওয়া করব, ইনশা\'আল্লাহ ইফরাও কথা মত নামাজ পড়ে খেতে আসলো তখন দেখল টেবিলের উপর তার বাবা বসা তাকে গিয়ে সালাম দিলো, তিনি গম্ভীর সুরে সালামের উত্তর নিল, তারপর টেবিলে আর কোন কথা হলো না চুপচাপ সবাই খেয়ে উঠে গেল, ইফরা রুমে তার মায়ের ফোন দিয়ে গেমস খেলছিল ওই সময় দেখল তার ভাইয়া ফোন দিয়েছে, তার মুখে চমৎকার একটি হাসি ফুটে উঠলো, ফোনে রিসিভ করে বলে উঠলো, ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ কেমন আছো ভাইয়া ? ভিডিও কলের ও প্রান্তে থেকে তার ভাই মিষ্টি হেসে সালামের উত্তর নিল,وَعَلَيْكُمُ ٱلسَّلَامُ وَرَحْمَةُ ٱللّٰهِ وَبَرَكَاتُهُ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি পাখি, তুই কেমন আছোত? এইতো আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর অশেষ রহমতে, কি করছিলি এতক্ষণ ভাইয়া বিশ্বাস কর এতক্ষণ আমি পড়ছিলাম মাত্র ফোনটা নিয়েছিলাম আম্মুর কাছ থেকে, মানে আমি বুঝিনা আমি যখনই পড়তে বসি তখন কেউ খবর নেই না যখন মোবাইল হাতে নিই তখনই বলে আমি নাকি শুধু ফাঁকিবাজি করি পড়াশোনা তুমি বলো ভাইয়া আমি কি এরকম? হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝছি আমি আমার বোনটা অনেক ভালো , তারপর এভাবে দুষ্টু মিষ্টি কথা বলতে লাগলো দুই ভাই বোন, আরো ফাতিহা তখন তার মোবাইলটা নিতে আসছিলেন তখন দেখলেন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দুই ভাই বোনের গল্প তার চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি পরলো কত দিন ধরে দুই ছেলে মেয়েকে একসাথে দেখেন না সবাই মিলে একসাথে গল্প করেন না, আরে আম্মু তুমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেন এই নাও তোমার গুণধর পুত্র কল দিয়েছে কথা বল, তার মা তার দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকালেন সে পাত্তা দিল না মোবাইল দিয়ে দিল, তিনিও মোবাইলটা নিয়ে তার ছেলের সাথে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন, ইফরাও বিছানা গুছিয়ে ঝাড়ু দিয়ে কোলবালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ল ঘুমের দোয়া পড়ে, [পরবর্তী পর্ব খুব শীঘ্রই আসবে ইনশাআল্লাহ]
0 Comments