অবনী ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না: দ্বিতীয় গল্প (রোমান্টিক — একটি গল্পসংকলন )
রোমান্টিক: দ্বিতীয় গল্পঅবনী ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না “যারা ভালোবাসায় বিশ্বাস করে তাদেরকেই একমাত্র ভালোবাসা যায়।কিন্তু যে বিশ্বাস করে না — তাকে ভালোবাসলে কী হয়?সে তোমার ভেতরে বেঁচে থাকে। চিরকাল।”— রোমান রাজু ঢাকায় অনেক ধরনের মানুষ আসে। কেউ আসে টাকার জন্য, কেউ স্বপ্নের জন্য, কেউ পালিয়ে, কেউ খুঁজতে। রোমান রাজু এসেছিল পড়তে। কিন্তু থেকে গেল অন্য কারণে — এমন একটা কারণ যেটা সে নিজেও পুরোপুরি বলতে পারে না, শুধু অনুভব করে।রোমান রাজু। নাম দুটো মিলিয়ে ডাবল আর। সে নিজেই এই নাম নিয়ে হাসে। বলে, “রোমান রাজু মানে দুইটা আর, কিন্তু কোনোদিন ট্রিপল আর হইনি। রাজামল্লী সিনেমার নায়কও না।” এই হাসিটা তার বৈশিষ্ট্য। যখন সবচেয়ে কষ্টে থাকে, তখনও হাসে। কিন্তু এই হাসির পেছনে যা আছে সেটা হাসি নয় — সেটা একটা দীর্ঘ অপেক্ষা, একটা অপূর্ণ নাম, একটা মৃত মানুষের কথা।রোমান বিশ্বাস করে — প্রতিটা মানুষ একটা চরিত্র। বাবা একটা চরিত্র, মা একটা চরিত্র, ভাই একটা চরিত্র, বোন একটা চরিত্র, প্রেমিকা একটা চরিত্র। মৃত মানুষও একটা চরিত্র — কারণ চরিত্র মরে না, শরীর মরে। এই দর্শনটা সে বানিয়েছে নিজে। কেউ শেখায়নি। কিন্তু এই দর্শনের পেছনে একটা ঘটনা আছে, একটা কথোপকথন, একটা নাম।অবনী।সেটা ছিল জানুয়ারি মাস। ঢাকার শীতে একটা বিশেষ গুণ আছে — কনকনে নয়, কিন্তু ঘরে থাকতে মন চায় না। বাইরের বাতাসে একটা পরিষ্কার টান থাকে, যেন শহরটা সকালে একটু ধুয়ে নেয় নিজেকে। কলেজের ক্লাসরুম। দ্বিতীয় বর্ষ। জানালা দিয়ে পুব দিকের রোদ আসছে — পাতলা, হলুদ। ফ্যানটা বন্ধ, কারণ শীতে ফ্যান চালানোর দরকার নেই।রোমানের বয়স তখন আঠারো।সে ক্লাসের মাঝারি ছাত্র। পড়াশোনায় খারাপ নয়, কিন্তু ক্লাসে মনোযোগ কম। সে বেশি সময় দেখে — জানালা দিয়ে বাইরে, বোর্ডের বদলে মানুষের মুখ, শিক্ষকের হাতের মুভমেন্টের বদলে পাশের মানুষের চোখ। সেদিন সে দেখছিল অবনীকে।অবনী ইসলাম। পেছনের সারিতে বসে, জানালার পাশে। শীতের আলোয় তার মুখটা একটু অন্যরকম দেখাচ্ছিল — ফ্যাকাশে কিন্তু উজ্জ্বল, যেন শীতের ফুলের মতো। সাদা হলুদ রঙের সালোয়ার কামিজ, মাথায় হলুদ ওড়না। চোখ দুটো বড়, কিন্তু ভেতরে একটা দূরত্ব আছে — যেন সে এই ক্লাসরুমে নেই, অন্য কোথাও আছে, এমন একটা জায়গায় যেখানে পৌঁছানো যায় না সহজে।রোমান তাকিয়ে রইল। বেশিক্ষণ।ক্লাস শেষে সবাই বের হচ্ছিল। রোমান দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে। অবনী বের হওয়ার সময় রোমান বলল, “একটু কথা বলা যাবে?”অবনী থামল। তাকাল। “হ্যাঁ।”করিডোরে দাঁড়িয়ে রোমান বলল — সরাসরি, কোনো ভূমিকা ছাড়া, যেভাবে সে সবকিছু করে — “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”অবনী তার দিকে তাকিয়ে রইল। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তারপর বলল, “আমি ভালোবাসায় বিশ্বাস করি না।”রোমান অবাক হলো। “কীভাবে বিশ্বাস করো না? মা তার সন্তানকে ভালোবাসে, ভাই বোনকে ভালোবাসে —”“বাসে হয়তো।”“তোমার বাবা-মা তোমাকে ভালোবাসে না?”অবনী একটু থামল। বাইরে তখন ক্লাসরুম থেকে বের হওয়া ছেলেমেয়েরা হল্লা করছে, কেউ হাসছে, কেউ ব্যাগ টানছে। কিন্তু তাদের দুজনের মাঝে একটা অদ্ভুত নীরবতা।“বাসে,” সে বলল। “কিন্তু আমি কাউকে ভালোবাসি না।”“তাহলে বেঁচে আছ কীভাবে?”অবনী তার দিকে একটু বিচিত্রভাবে তাকাল। যেন এই প্রশ্নটার উত্তর সে আগে থেকে জানে, এবং সেই উত্তর খুব সহজ।“এখন আছি,” সে বলল। “বেশিদিন থাকব না।”রোমান ভাবল সে রাগের কথা বলছে। কিন্তু অবনীর চোখে রাগ ছিল না। ছিল একটা শান্ত, স্থির সত্য — যেভাবে মানুষ বলে “আজকে বৃষ্টি হবে” দেখে বোঝা যাচ্ছে বলে। সে চলে গেল করিডোর দিয়ে, হলুদ ওড়না একটু পেছনে উড়ছে।রোমান করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল। জানালা দিয়ে জানুয়ারির রোদ আসছে — পাতলা, হলুদ, অবনীর ওড়নার রঙের মতো। সে বুঝল না শেষ কথাটার মানে। বুঝল পরে। অনেক পরে।অবনী ইসলামের হৃদপিণ্ডে জন্ম থেকে একটা ছিদ্র ছিল। এই ছিদ্রটার কথা সে জানত — ডাক্তার বলেছিলেন বড় হওয়ার সাথে সাথে সমস্যা বাড়বে, অপারেশন করা যায় কিন্তু ঝুঁকি আছে। তার পরিবার গরিব ছিল না, কিন্তু এই অপারেশনের সাহস করতে পারছিল না। তারা অপেক্ষা করছিল, হয়তো ভাবছিল পরে দেখা যাবে। অবনীও অপেক্ষা করছিল — কিন্তু ভিন্নভাবে। সে জানত তার শরীর একটা সময়সীমায় আছে। এই জানাটা তাকে অদ্ভুত করে দিয়েছিল। সে মানুষকে দেখত অন্যভাবে, ভালোবাসাকে দেখত অন্যভাবে।সে ভাবত — মানুষ আশার কারণে ভালোবাসে। আশা থাকলে ভালোবাসা থাকে, আশা শেষ হলে ভালোবাসাও শেষ। তার নিজের জীবনে আশার পরিমাণ সীমিত — তাহলে সে কাউকে ভালোবাসলে শেষ পর্যন্ত কষ্টটা কার হবে? তার নিজের নয়, বরং যাকে ভালোবেসেছে তার। তাই সে ভালোবাসায় বিশ্বাস করত না। এটা তার দোষ ছিল না। এটা তার হৃদপিণ্ডের ছিদ্রের দর্শন।রোমান এই সব জানত না। সে শুধু জানত একটা মেয়ে তাকে বলেছে ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না। রাতে ঘুমাতে পারেনি। সকালে উঠে হঠাৎ ভাবল — রক্ত পরীক্ষা করাবে। পড়েছিল কোথাও — হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন হয়, রক্তের গ্রুপ মিললে সম্ভব। সে ভাবল যদি অবনীর হৃদপিণ্ডে সমস্যা থাকে, আমি আমারটা দিয়ে দেব। এই ভাবনাটা পাগলামি, কিন্তু রোমান রাজু সেইদিন থেকেই এইরকম।রক্ত পরীক্ষা করাল। ব্লাড গ্রুপ মিলল না — তিনটা আলাদা গ্রুপ। সে হতাশ হলো। ভাবল অন্য কিছু করা যাবে। কিন্তু কিছু করার আগেই এলো সেই ফোন।বছর খানেক পরে। ফেব্রুয়ারি মাস। ঢাকায় তখন বসন্তের শুরু — শীত যাচ্ছে, গরম আসছে না এখনো, গাছে নতুন পাতা, আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে একটা মিষ্টি অনিশ্চয়তা।রোমানের ফোনে একটা কল এলো। অবনীর ক্লাসের এক বান্ধবী। গলা কাঁপছে।“রোমান ভাই… অবনী…”“কী হয়েছে?”“অবনী মারা গেছে।”রোমান ফোনটা হাতে ধরে রইল। বাইরে ফেব্রুয়ারির রোদ — উজ্জ্বল, হলুদ। সে বসল মেঝেতে। সামনের দেওয়ালে চুপ করে তাকিয়ে রইল।তার মাথায় একটাই কথা — “বেশিদিন থাকব না।”সে জানত। সে জানত এবং তবুও বলেছিল — ভালোবাসায় বিশ্বাস করি না। কারণ সে জানত ভালোবাসা এলে আশা আসে। আর আশা তার মতো মানুষের জন্য নয়। রোমান সেইদিন বুঝল — অবনীর “ভালোবাসায় বিশ্বাস নেই” কথাটা আসলে ছিল তার বাঁচার উপায়। যে জানে সে বেশিদিন নেই, সে নিজেকে ভালোবাসা থেকে দূরে রাখে — যাতে কাউকে কষ্ট দিতে না হয়। কিন্তু রোমান কষ্ট পেয়েই গেল।রোমানের বড় ভাই ইমন। ইমন একটা শক্ত মানুষ, কথা সরাসরি বলে, নরম করে বলে না। অবনীর মৃত্যুর পরে রোমান যখন ঘরে বসে ছিল — কয়েকদিন ক্লাসে যায়নি, খাবার কম খেয়েছে, কথা কম বলেছে — ইমন একদিন সন্ধ্যায় ঘরে ঢুকল। রোমান তখন বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে। ঘরে আলো জ্বলেনি তখনো, বাইরে সন্ধ্যার আলো কমছে।ইমন বলল, “মরা মানুষকে নিয়ে এইভাবে থাকলে চলবে না।”রোমান কিছু বলল না।“মানুষ মরে যায়। এটাই স্বাভাবিক। তুমি কি তাকে বিয়ে করেছিলে? প্রেম করেছিলে?”“একবার কথা বলেছিলাম।”ইমন থামল। ঘরে আলো নেই, তবু রোমানের মুখটা দেখা যাচ্ছে।“একবার কথা বলার জন্য এইভাবে শুয়ে আছিস?”রোমান উঠে বসল। তার চুল এলোমেলো, চোখে ঘুম নেই কয়েকদিনের।“ভাইয়া, তুমি বুঝবে না।”“কী বুঝব না?”“একটা মানুষ তোমার জীবনে একবার আসতে পারে, একটা কথা বলতে পারে। কিন্তু সেই কথা যদি এমন হয় যে সারাজীবন মাথায় থাকে — তাহলে সেটা একবার না। সেটা সারাজীবন।”ইমন তার ভাইয়ের দিকে তাকাল। বলার মতো কিছু খুঁজল। পেল না। চলে গেল। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে একবার ঘুরল।“পাগলামি করিস না।”“পাগলামি না ভাইয়া। রোমান্টিক হচ্ছি।”ইমন হাঁটতে লাগল, কিন্তু রোমান দেখল তার পায়ের গতি একটু ধীর হয়েছে। হয়তো বুঝেছে কিছু। হয়তো বোঝেনি। ইমনের বিশেষত্ব হলো সে বেশি সত্য কথা বলে, এবং বেশি সত্য কথা শুনলে রোমানের মাথা ফ্রিজ হয়ে যায়। ইমন বলে মেয়েরা বাচ্চা জন্মের মেশিন — রোমান মানে না। ইমন বলে মরা মানুষকে ভালোবাসার মানে নেই — রোমান মানে না।কিন্তু ইমনের এই কঠিন কথাগুলো রোমানকে একটা জিনিস দিয়েছে — সে নিজের দর্শন তৈরি করেছে ইমনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে। ইমন বলে সব মানুষ ব্যবহারিক, রোমান বলে সব মানুষ চরিত্র। ইমন বলে মরা মানুষকে মনে রাখা সময়ের অপচয়, রোমান বলে চরিত্র মরে না শুধু শরীর মরে। ইমনের কঠিনতা থেকেই রোমানের নরম দর্শন তৈরি হয়েছে।রোমানের ছোট বোন মীনা। বয়সে ছোট কিন্তু বুদ্ধিতে বড়, মুখে টক-ঝাল-মিষ্টি একসাথে। অবনীর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পরে মীনা রোমানের ঘরে এলো। রোমান তখন একটা কাগজে কিছু লিখছে — টেবিলে ঝুঁকে, হাতে কলম, মুখে গভীর মনোযোগ।মীনা ঢুকে দেখল কাগজে অবনীর নাম।“ভাইয়া।”“হুম।”“যে চলে গেছে তাকে যেতে দাও।”রোমান কলম থামাল। “তোর কী মনে হয়, সে গেছে?”“মারা গেছে তো।”“শরীর গেছে,” রোমান বলল। “চরিত্র গেছে না।”মীনা তার ভাইয়ের দিকে তাকাল — এই মানুষটাকে সে চেনে ছোটবেলা থেকে, কিন্তু এইভাবে কখনো বলতে শোনেনি।“ভাইয়া, তার সাথে তুমি কতবার কথা বলেছ?”“একবার।”মীনা হা করে থাকল। তারপর চোখ বড় করল। “হায় হায়! একবার? একবার কথা বলেছ আর এই অবস্থা?”রোমান স্টাইল করে বলল, “এসব বড়দের ব্যাপার, তুমি ছোট। বুঝবে না।”“বুঝি না! ওই মেয়ের সাথে তুমি একবারও ঘুরতে যাওনি, একবারও হাত ধরোনি —”“মীনা।”“কী?”“সে বলেছিল — বেশিদিন থাকব না।”মীনা চুপ করে গেল। ঘরে একটা নীরবতা এলো। বাইরে রাস্তায় রিকশার ঘণ্টা বাজছে।রোমান বলল, “সে জানত সে মরবে। তাই ভালোবাসতে চায়নি — কাউকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নয়। সে বলেছিল ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না। কিন্তু আমি মনে করি সে আসলে ভালোবাসাকে এত ভালোবাসত যে নিজে ভালোবাসতে পারেনি।”মীনা তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তুমি পাগল।”“হ্যাঁ।”“কিন্তু সুন্দর পাগল।”দুজনেই হাসল। সেই হাসিতে কষ্ট ছিল, কিন্তু উষ্ণতাও ছিল। মীনা বুঝল — এই ভাইটাকে থামানো যাবে না। শুধু পাশে থাকা যাবে।বছর গেল। রোমান ঢাকায় থাকে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আসে — ক্লাস শেষ হলো, একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ পেল, কিছুদিন পরে ছেড়ে দিল, আরেকটা কাজ পেল। মাঝারি বেতন, মাঝারি জীবন, কিন্তু ভেতরে একটা জায়গায় কিছু একটা অমাঝারি আছে সবসময়।ঢাকার মিরপুরের একটা ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকে। বাবা সরকারি চাকরি থেকে অবসরে, মা ঘর সামলান। ইমন বিয়ে করেছে, আলাদা থাকে। মীনা এখনো পড়ছে।কিন্তু প্রতিটা পর্যায়ে একটা জিনিস আছে — অবনীর কথা। সকালে উঠলে মনে হয়, রাতে ঘুমানোর আগে মনে হয়। বাসে পাশে কেউ বসলে মনে হয় — এই মানুষটাও একটা চরিত্র, কিন্তু অবনী নয়।রোমান একটা তত্ত্ব দাঁড় করাল নিজের মনে। মানুষ মানে শরীর নয়, মানুষ মানে চরিত্র। বাবা মারা গেলে বাবার চরিত্রটা থাকে — বাবা যেভাবে কথা বলতেন, যেভাবে হাসতেন, যেভাবে রাগ করতেন — সেই চরিত্র তার সন্তানের মধ্যে বেঁচে থাকে। অবনী মরে গেছে। কিন্তু অবনীর চরিত্র মরেনি। সে খুঁজবে — অন্য কোনো মানুষের মধ্যে যদি অবনীর চরিত্রের আভাস পাওয়া যায়, যে ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভালোবাসার জন্য তৈরি — সেই মানুষকে সে খুঁজবে।কীভাবে খুঁজবে? এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে গিয়ে রোমান কিছু কাজ করল যেগুলো পাড়ার মানুষ দেখলে মাথায় হাত দেবে।একদিন সকালে মিরপুরের রাস্তায় একটা মাইকের রিকশা দেখে তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। সে ভাড়া নিল রিকশাটা। বিকেলে বের হলো। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, পায়ে সাধারণ স্যান্ডেল, মাথার চুল আঁচড়ানো। মাইকে বলল, “অবনী, তুমি কোথায়?” রিকশা চলল। পাড়ার মানুষ বের হয়ে দেখতে লাগল — কে, কেন। “অবনী তুমি কোথায়?”একটা মহিলা রিকশা থামাল। “ভাই, কী হয়েছে?”“অবনীকে খুঁজছি।”“কোন অবনী?”“আমার অবনী।”মহিলা একটু থামল। তারপর বলল, “কোনো মাইকে আমার নাম ধরেও তো ডাকছিলেন — লাবনী তুমি কোথায়!”রোমান লজ্জায় মাথা নিচু করল। “লাবনী না। অবনী।”মহিলা চলে গেল। রোমান মাইক বন্ধ করল। পাশের দোকানদার হাসছে। রিকশাওয়ালা ফিচেল হাসছে। রোমান বুঝল এভাবে খোঁজা সম্ভব না। কিন্তু থামল না সে।পরের সপ্তাহে নতুন পরিকল্পনা। ছোট ছোট কাগজের চিরকুট বানাল। লিখল — “আমার হৃদয়ের লটারি। মাত্র দশ টাকায়। বিজয়ী পাবে রোমান রাজুর হৃদয়।” বাসে, রাস্তায়, কলেজের সামনে বিলাতে লাগল। একটা মেয়ে বলল, “তোমার হৃদয় এত সস্তা?”রোমান বলল, “সস্তা না। কিন্তু দশ টাকায় কেউ কেনে না — তাই দশ টাকাই রেখেছি। আমি মেয়ে হলে কিনতাম — কারো হৃদয় জেতার সুযোগ কখনো হাতছাড়া করতাম না।”মেয়েটা হেসে চলে গেল। রোমান দাঁড়িয়ে রইল, হাতে চিরকুট, পথে মানুষ হাঁটছে। মীনা দূর থেকে দেখছিল এই পুরো দৃশ্যটা। বাড়ি ফিরে বলল, “ভাইয়া, তুমি সত্যিকারের পাগল হয়ে যাচ্ছ।”রোমান বলল, “না মীনা। রোমান্টিক হচ্ছি।”“পার্থক্য বোঝাও।”রোমান একটু চিন্তা করল। বাইরে সন্ধ্যা নামছে, ঘরে বাল্বের হলুদ আলো।“পাগল মানুষ নিজেকে হারায়। রোমান্টিক মানুষ নিজেকে খোঁজে।”মীনা বলল, “তাহলে তুমি কোনটা?”“দুটোই। একসাথে।”মীনা হাসল। রোমানও হাসল।ইমন পাশ থেকে বলল, “পাগলামো বন্ধ কর। বিয়ে কর।”রোমান বলল, “ভাইয়া, বিয়ে করব।”“কখন?”“যখন অবনীকে খুঁজে পাব।”মা থামলেন রান্নাঘরের দরজায়। বললেন, “মরা মানুষ কি ফিরে আসে?”“শরীর আসে না। চরিত্র আসে।”মা আর কথা বললেন না। ইমন “পাগল” বলল। রোমান “রোমান্টিক” বলল। মীনা হাসল। এই কথোপকথন বারবার হয়। এবং প্রতিবার একই শেষ।রোমানের ঢাকার বাসায় একটা ছোট বারান্দা আছে। বারান্দাটা মাঝারি আকার, দুই পাশে রেলিং, মাঝে কিছুটা জায়গা। অবনীর মৃত্যুর পরে সে এই বারান্দায় তিনটা গাছ লাগাল। সাদা পদ্ম। লাল গোলাপ। চন্দ্রমল্লিকা। কেন এই তিনটা? রোমান বলে — অবনীর কথা মনে করলে এই তিনটা রঙ মাথায় আসে। সাদা — তার পোশাকের রঙ, জানুয়ারির সেই হলুদ ওড়নার মতো একটা শীতল পরিষ্কারতা। লাল — তার চোখের ভেতরের কিছু একটা যেটা বলা যায় না, যেটা ছিল কিন্তু দেখা যেত না। আর চন্দ্রমল্লিকা — কারণ চন্দ্রমল্লিকা ঠান্ডায় ফোটে, শীতে ফোটে, অবনীর মতো।সে প্রতিদিন বারান্দায় আসে। গাছগুলো দেখে। পানি দেয়। এই সময়টায় সে কথা বলে — নিজের মনে, অবনীর সাথে। “অবনী, আজকে লাল গোলাপে একটা নতুন কুঁড়ি এসেছে।” “অবনী, আজকে বৃষ্টি হয়েছিল। পদ্মটা ভিজেছে।” “অবনী, তুমি বলেছিলে ভালোবাসায় বিশ্বাস করো না। আমি এখনো বুঝতে পারি না।” পরিবার দেখে। কেউ কিছু বলে না। কারণ তারা বোঝে — রোমানকে এইটুকু দরকার।মীনা একদিন বারান্দায় এলো। বিকেলে, রোদ পড়তে শুরু করেছে, বারান্দায় কমলা আলো।“ভাইয়া, এই গাছগুলো কি অবনীর জন্য?”“হ্যাঁ।”“সে কি জানত তুমি এইরকম করবে?”রোমান পানির কলসটা রেখে সোজা হলো। “জানত না। কিন্তু হয়তো এটাই চাইত।”“কেন?”“কারণ সে যখন বলেছিল ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না — সে আসলে বলেছিল সে ভালোবাসা পেতে চায় না, যাতে কাউকে কষ্ট না দিতে হয়। কিন্তু সে যদি দেখত তার জন্য তিনটা গাছ আছে — তাহলে হয়তো বলত, এটা কষ্ট না। এটা সুন্দর।”মীনা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “তুমি সত্যিই ওকে ভালোবাসতে।”“হ্যাঁ।”“একবার কথা বলেই?”“একবার কথা বলেই।”মীনা বারান্দায় বসল। বাতাস আসছিল। চন্দ্রমল্লিকার পাতা নড়ছিল।“ভাইয়া, তুমি কি কখনো থামবে?”রোমান আকাশের দিকে তাকাল — সন্ধ্যার আকাশ, কমলা থেকে নীল হচ্ছে।“না।”“কেন?”“কারণ থামলে সে মরে যাবে পুরোপুরি।”মীনা কিছু বলল না। শুধু গাছের দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাস আসছিল, চন্দ্রমল্লিকার ফুল একটু কাঁপল।বছরের পর বছর কাটল। রোমান বিভিন্ন মানুষের সাথে পরিচিত হলো। মৃদুল ছিল এক বন্ধু — সে সব ছেড়ে চলে গেছে সমুদ্রের পাড়ে। একবার রোমান কক্সবাজার গিয়ে তাকে দেখল হঠাৎ — স্পিডবোট চালাচ্ছে, পাশে একটা রাশিয়ান মেয়ে। মৃদুল বলল, “আমি আমাকে ভালোবাসি। আমার আল্লাহ আমাকে ভালোবাসেন।” রোমান মুচকি হাসল। তার সাথে সমুদ্রের পাড়ের বাসায় গেল, সুঁটকি খেল, সন্ধ্যায় সমুদ্র দেখল। জলের শব্দে অবনীর কথা মাথায় এলো।রবিন ছিল আরেক বন্ধু — বলত, “মানুষ একটু এসে তোমাকে অভ্যস্ত করে, তারপর শোষণ করে। যখন তুমি তাকে গুরুত্ব দেবে, সে তোমাকে খালি করে চলে যাবে।” রোমান শুনত। মাথায় রাখত। কিন্তু কাউকে পুরোপুরি দূরে রাখত না, কারণ সে বিশ্বাস করত প্রতিটা মানুষের মধ্যে একটা চরিত্র আছে, সেই চরিত্রটা পড়তে হয়।একবার সে ইন্দোনেশিয়া গেল — বালি। পাহাড়, সমুদ্র, মন্দির, রাস্তায় রঙিন প্রার্থনার ফুল। যাদের সাথে পরিচয় হলো তাদের রোমান চরিত্র দিয়ে মনে রাখল। জায়গা একই শুধু নায়ক আলাদা, নায়িকা আলাদা। সেখানে জানল এক প্রাণীর মল দিয়ে কফি বানানো হয়। সেই কফি খেল। ভালো লাগল।মীনাকে বলল ফিরে এসে, “বালিতে গিয়ে জানলাম এক প্রাণীর মল দিয়ে কফি বানানো হয়।”“তারপর?”“সেই কফি খেলাম।”“কেমন ছিল?”“ভালো। কিন্তু অবনীকে পাইনি।”মীনা বলল, “বালিতে খুঁজছিলে?”“সব জায়গায় খুঁজি।”মীনা তার ভাইয়ের দিকে তাকাল। এই মানুষটাকে সে ভালোবাসে — অদ্ভুত রকমভাবে, নিজের অস্তিত্বের সাথে মিলিয়ে।রোমানের বয়স ত্রিশ হলো।ফেব্রুয়ারি মাস। সেই একই মাস। বাইরে বসন্তের শুরু — পলাশ ফুটেছে কোথাও কোথাও, বাতাসে ধুলো আর ফুলের মিশ্র গন্ধ।এই মাসটা রোমানের জন্য কঠিন। সকালে উঠে বারান্দায় গেল। লাল গোলাপে ফুল ফুটেছে। চন্দ্রমল্লিকা ভালো আছে। সাদা পদ্ম একটু শুকিয়েছে। পানি দিল। হাত কাঁপছে।বারো বছর।বারো বছর ধরে এই গাছগুলো আছে। বারো বছর ধরে এই মানুষটা বেঁচে আছে — মৃত একটা মানুষকে বুকে নিয়ে। ত্রিশ বছরে একটা মানুষের জীবন কোথায় থাকার কথা? প্রতিষ্ঠিত, পরিবার, স্বপ্ন। তার কাছে প্রতিষ্ঠা আছে, পরিবার আছে। কিন্তু স্বপ্নটা এখনো একটা মৃত মেয়ের চোখের মধ্যে।সেই বিকেলে রোমান বের হলো। পরনে ঢিলা পায়জামা আর একটা পুরনো নীল শার্ট, চুল এলোমেলো, পায়ে স্যান্ডেল। কোথায় যাবে জানে না। মিরপুরের রাস্তায় হাঁটছে। বিকেলের রোদ পড়তে শুরু করেছে — বাড়ির গায়ে কমলা আলো, রাস্তায় লম্বা ছায়া।সে হাঁটছে। মাথায় একটাই প্রশ্ন — কতদিন এইভাবে চলবে? অবনীকে ছাড়তে পারছে না, অন্য কাউকে নিতে পারছে না, মাঝামাঝিতে আছে।একটা পার্কের কাছে একটা পুরনো বেঞ্চে বসল। রঙ উঠে গেছে, কাঠ একটু মরিচা। চারদিকে মানুষ — বাচ্চা দৌড়াচ্ছে, রিকশা যাচ্ছে, দূরে কেউ চা খাচ্ছে দোকানে। রোমান মাথা নিচু করে বসে রইল। কিছু দেখছে না।তখন একজন এসে তার পাশে বসল।মাঝবয়সী মানুষ। মোটা ফ্রেমের চশমা। পরনে সাধারণ কাপড় — একটা চেকড শার্ট, প্যান্ট, পায়ে স্যান্ডেল। কাঁধে একটা ব্যাগ। মুখে হাসি — বড়, প্রকাশ্য, যেন এই হাসি তার স্থায়ী ভাব।একটা ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করল। রোমানের দিকে বাড়াল।“নাও।”রোমান তাকাল। “আমার জন্য?”“তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে পানি খাওনি অনেকক্ষণ। নাও।”রোমান বোতলটা নিল। পানি খেল। ঠান্ডা। মুহূর্তের জন্য বুকের ভারটা একটু কমল।“ধন্যবাদ।”“কী ভাবছিলে?”রোমান তাকাল। “চেনেন না আমাকে।”“চিনি না। কিন্তু দেখলে বোঝা যায় — কেউ একটা জায়গায় আটকে আছ।”রোমান কিছু বলল না। বাইরে বিকেলের শেষ রোদ আসছে। দূরে আজানের শব্দ।“আমার নাম আশিক।”“রোমান।”“কোথা থেকে?”“ঢাকাই।”আশিক একটু হাসল। তারপর বলল, “মিয়া, কী হয়েছে?”রোমান জানে না কেন — এই অচেনা মানুষটার সাথে কথা বলতে মন চাইল। হয়তো কারণ অচেনা মানুষের কাছে কথা বলা সহজ। বিচার নেই। পরিচয়ের ভার নেই।“একটা মানুষকে ভালোবাসতাম। বারো বছর আগে মারা গেছে।”আশিক চুপ করে শুনল।“একবার কথা বলেছিলাম। একবারই। সে বলেছিল ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না।”“তারপরও ভালোবাসলে?”“হ্যাঁ।”আশিক একটু ভাবল। বিকেলের শেষ আলো তাদের দুজনের মুখে পড়ছে। পার্কের বাচ্চারা খেলছে। একটা বাচ্চা হঠাৎ হেসে উঠল জোরে।আশিক বলল, “রুমি একটা কথা বলেছিলেন — ‘তোমার ক্ষত হলো সেই জায়গা যেখান দিয়ে আলো ঢোকে।’ তোমার অবনী তোমার ক্ষত। কিন্তু সেই ক্ষত দিয়ে আলো ঢুকেছে — তোমার ভালোবাসার আলো। সে ভালোবাসায় বিশ্বাস করেনি, কিন্তু তুমি করো। এটাই তোমার শক্তি।”রোমান বলল, “কিন্তু বারো বছর ধরে —”“বারো বছর কোথায় রেখেছ তাকে?”“মনে।”“মন একটা ঘর। ঘরে যদি শুধু একজন থাকে, বাকি ঘরটা ফাঁকা থাকে। ফাঁকা ঘর ঠান্ডা হয়।” আশিক বলল, “তুমি কি চাও সে শুধু মনে থাকুক?”“না।”“তাহলে?”রোমান বলল, “বুঝতে পারছি না।”আশিক উঠে দাঁড়াল। সন্ধ্যা নামছে। পার্কের আলো জ্বলে উঠল।“মিয়া, একটা কথা। তোমার হৃদয় যা বলছে — তা করো। যুক্তি দিয়ে নয়। হৃদয় দিয়ে।”রোমান তাকাল। “কী করব?”“জানো তুমি।”আশিক হাঁটতে লাগল — ব্যাগ কাঁধে, পায়ে স্যান্ডেল, মুখে সেই হাসি যেটা তার স্থায়ী ভাব। সন্ধ্যার আলোয় একটা মানুষ হাঁটছে পার্কের পথ ধরে। রোমান তার যাওয়া দেখল। মানুষটার নাম জানে — আশিক। কোথা থেকে এসেছে জানে না। কোথায় গেল জানে না। কিন্তু পানির বোতলটা এখনো হাতে। ঠান্ডা।রোমান বাসায় ফিরল। রাতে বসে রইল অনেকক্ষণ। ঘরে একটা বাল্ব জ্বলছে, বাইরে ঢাকার রাতের শব্দ। আশিক বলেছে — হৃদয় যা বলছে তা করো। হৃদয় কী বলছে? হৃদয় বলছে — অবনী মনে নয়, কাছে থাকুক। কিন্তু অবনী কোথায়? অবনীর কবর — তার মামার বাড়িতে, গ্রামে, যেখানে সে জন্মেছিল।রোমান উঠল। মীনার ঘরে গেল। মীনা ঘুমাচ্ছিল। সে ডাকল না। ফিরে এলো। সারারাত বসে রইল। ভাবল।ভোরে উঠল। কাপড় পরল — সাদা পাঞ্জাবি, নীল লুঙ্গি, পায়ে স্যান্ডেল। একটা ছোট ব্যাগ নিল। বাড়ি থেকে বের হলো। বাস ধরল। তারপর সিএনজি। তারপর হাঁটা।অবনীর মামার বাড়ির গ্রাম। ছোট গ্রাম — চারদিকে সবুজ। মাঠ আছে, পুকুর আছে। বাড়িগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে, মাঝে মাঝে গাছ। ফেব্রুয়ারির বিকেল — আকাশে পাতলা মেঘ, রোদ আছে কিন্তু তীব্র নয়, বাতাস মৃদু। এই ধরনের বিকেলে পৃথিবীটা একটু ধীর হয়ে যায়, একটু শান্ত।রোমান গেল কবরস্থানে। গ্রামের পুরনো কবরস্থান — গাছপালায় ঘেরা, মাঠের পাশে, বড় একটা শিরীষ গাছ আছে কোণে। বিকেলের আলোয় শিরীষ গাছের পাতা উজ্জ্বল সবুজ। অবনীর কবর। সাদা সিমেন্টের ফলক। নাম লেখা — অবনী ইসলাম।রোমান দাঁড়াল।বারো বছর।বারো বছর পরে প্রথম এলো।সে বসল কবরের পাশে। মাটিতে হাত রাখল। ঠান্ডা, একটু আর্দ্র। গ্রামের মাটির একটা গন্ধ আছে — মাটির গন্ধ, ঘাসের গন্ধ, আর কী একটা যেটা বলা যায় না কিন্তু চেনা মনে হয়।রোমান বলল, অনেকক্ষণ চুপ থেকে, চারপাশের নীরবতাকে সাক্ষী রেখে, “তুমি বলেছিলে ভালোবাসায় বিশ্বাস করো না। আমি বিশ্বাস করি। এই বিশ্বাস বারো বছর ধরে আছে। থাকবে।”বাতাস এলো। গাছের পাতা নড়ল — শিরীষ গাছের পাতা।রোমান বলল, “আমার বাগানে তোমার জন্য তিনটা গাছ আছে। সাদা পদ্ম। লাল গোলাপ। চন্দ্রমল্লিকা। বারো বছর ধরে আছে।”সন্ধ্যা নামছে। আকাশে প্রথম তারা দেখা গেল। কোথাও দূরে একটা পাখি ডাকল।রোমান উঠল। তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট মাটির কৌটা বের করল। সে কবরের মাটি নিল — এক মুঠো। মাটি হাতে নিল, অনুভব করল। তারপর কৌটায় রাখল, ধীরে বন্ধ করল।উঠে দাঁড়াল। কবরের দিকে তাকাল। সন্ধ্যার আলোয় সাদা ফলকটা একটু উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।বলল, “তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। তোমার বাগানে।”রোমান ফিরে এলো ঢাকায়। রাতে। বাস থেকে নামল, রিকশা নিল, বাড়ি পৌঁছাল। মা জেগে বসে আছেন। “কোথায় গিয়েছিলি?”“একটু বাইরে।”মা আর কিছু বললেন না। তাঁরা বোঝেন রোমানকে। সামলে রাখেন।রোমান সরাসরি বারান্দায় গেল। রাতের বারান্দা — চাঁদের আলো আসছে, গাছগুলো একটু ঝিমিয়ে আছে।চন্দ্রমল্লিকায় ফুল আছে — সাদা, হালকা বেগুনি, চাঁদের আলোয় অদ্ভুত সুন্দর। লাল গোলাপ রাতে বন্ধ, ঘুমাচ্ছে। সাদা পদ্ম পানির মধ্যে।রোমান সাদা পদ্মের কাছে গেল। মাটি সরাল একটু। অবনীর মামার বাড়ির গ্রামের মাটি — সেই কৌটার মাটি — ঢেলে দিল গোড়ায়। হাত দিয়ে মেশাল। মিলিয়ে দিল। গ্রামের মাটি আর ঢাকার বারান্দার মাটি। অবনীর মাটি আর রোমানের বাগানের মাটি। একসাথে।রোমান সোজা হলো। হাত মুছল। চাঁদের দিকে তাকাল। ফেব্রুয়ারির চাঁদ — উজ্জ্বল, পরিষ্কার, যেন বারো বছর ধরে অপেক্ষা করছিল এই মুহূর্তটার জন্য।বলল, নিচু গলায়, “এখন তুমি এখানে।”বাতাস এলো। পদ্মের পাতা নড়ল। চন্দ্রমল্লিকার ফুল একটু কাঁপল — যেন শ্বাস নিল।রোমান বারান্দায় বসল। পা ছড়িয়ে, হেলান দিয়ে। পরনে সেই সাদা পাঞ্জাবি, একটু মাটি লেগেছে এখন। মীনা দরজায় এসে দাঁড়াল। জেগে ছিল।“ভাইয়া? এতরাতে?”“আয়।”মীনা এলো। পাশে বসল।“কোথায় গিয়েছিলে?”“অবনীকে আনতে।”মীনা গাছগুলোর দিকে তাকাল। সাদা পদ্মের গোড়ায় একটু নতুন মাটির আভাস। বুঝল।কিছু বলল না।শুধু পাশে বসে রইল। দুই ভাই-বোন, চাঁদের আলোয়, বারান্দায়, তিনটা গাছ সামনে।সকালে উঠে রোমান দেখল মীনা চলে গেছে। কিন্তু বারান্দার রেলিঙে একটা চিরকুট রাখা।“ভাইয়া, অবনী এখন তোমার বাগানে। ঘুমাও।”রোমান হাসল।লোকে বলে মানুষ ভালোবাসা হারালে নতুন ভালোবাসা খোঁজে। রোমান রাজু খুঁজেছিল। মাইকের রিকশায়, লটারির চিরকুটে, বালির সমুদ্রে। কিন্তু পায়নি। কারণ অবনী একটা বিশেষ চরিত্র — যে জানে সে বাঁচবে না, তবুও হাসে, যে ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না কারণ সে ভালোবাসাকে অনেক বেশি সম্মান করে। এই চরিত্র একটাই ছিল, একটাই থাকবে।রোমান এখন জানে — দ্বিতীয় অবনী নেই। কিন্তু অবনীর চরিত্র আছে। সেই চরিত্র এখন তার বাগানে। সাদা পদ্মের গোড়ায়।রোমান একটা কথা বিশ্বাস করে যা সে কখনো জোরে বলে না, কিন্তু বারান্দায় গাছে পানি দেওয়ার সময় মনে মনে বলে। মানুষ মানে চরিত্র। বাবা মারা যান — কিন্তু বাবার ভালোবাসার ধরনটা সন্তানের মধ্যে থাকে। মা মারা যান — কিন্তু মায়ের কণ্ঠস্বর স্মৃতিতে থাকে। অবনী মারা গেছে — কিন্তু অবনীর সেই কথাটা থাকে: “আমি ভালোবাসায় বিশ্বাস করি না।”এই কথাটাই রোমানকে বানিয়েছে।আশিক সেদিন বলেছিল — হৃদয় যা বলছে তা করো। রোমান তাই করেছে। কিন্তু আশিক কে ছিল? রোমান জানে না। আর কোনোদিন দেখেনি। শুধু একটা পানির বোতল, শুধু একটা কথা, শুধু একটা বিকেল। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট ছিল।ফেব্রুয়ারির এক সকালে। রোমান বারান্দায় দাঁড়িয়ে। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, পায়ে কিছু নেই, চুল এখনো এলোমেলো। সামনে তিনটা গাছ। সাদা পদ্মে একটা নতুন ফুল ফুটেছে — ভোরের আলোয় সাদা, টলটলে। লাল গোলাপে দুটো কুঁড়ি। চন্দ্রমল্লিকায় অনেকগুলো ফুল, শীতের শেষের ঠান্ডায় যেন আরো উজ্জ্বল।বাইরে ঢাকা জেগে উঠছে — রিকশার ঘণ্টা, বাসের হর্ন, কোথাও থেকে আজান।রোমান বলল, শান্তভাবে, কোনো কষ্ট ছাড়া, কোনো আকুলতা ছাড়া — “অবনী, তোমার পদ্মে ফুল এসেছে।”বাতাস এলো। পদ্মের সাদা পাপড়ি একটু নড়ল। চন্দ্রমল্লিকার কয়েকটা ফুল একসাথে একটু কাঁপল।রোমান হাসল।তারপর ঘরে গেল। চা বানাল। মীনা উঠে এলো ঘুমঘুমে চোখে, চুলে বিনুনি ঝুলছে।“কী করছ?”“চা।”“দাও।”দুজন চা খেল। বিশেষ কথা বলল না। শুধু পাশে থাকল। বাইরে ঢাকার সকাল চলছে — হাজার মানুষের হাজার গল্প নিয়ে। রোমানের বারান্দায় তিনটা গাছ। একটা মৃত মেয়ের মাটি। এবং একটা জীবিত মানুষের বিশ্বাস —ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না বলেছিল সে।কিন্তু যে বলে ভালোবাসায় বিশ্বাস নেই —সে আসলে ভালোবাসাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে।তাই ভয় পায়।তাই সরে থাকে।তাই মরে যায়।কিন্তু থেকে যায়।চিরকাল।
অবনী ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না: দ্বিতীয় গল্প (রোমান্টিক — একটি গল্পসংকলন )
গল্পের সারাংশ (দ্বিতীয় গল্প) ঢাকার জীবনে অনেকেই আসে। রোমান রাজু এসেছিল পড়তে। কিন্তু থেকে গেল একটা অদ্ভুত কারণে — যেটা সে নিজেও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না।রোমান রাজু হাসি-খুশি ছেলে। কষ্টের সময়েও হাসে। তার একটা নিজস্ব দর্শন আছে — প্রত্যেক মানুষ আসলে একটা ‘চরিত্র’। শরীর মরে যায়, চরিত্র মরে না। এই বিশ্বাসের জন্ম একটা মেয়েকে দেখে।জানুয়ারির শীতে কলেজে প্রথম দেখা অবনী ইসলামের সাথে। জানালার পাশে বসা, হলুদ ওড়না, বড় চোখ — কিন্তু চোখে একটা দূরের দূরত্ব। ক্লাস শেষে রোমান সরাসরি গিয়ে বলে, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”অবনী শান্ত গলায় উত্তর দেয়, “আমি ভালোবাসায় বিশ্বাস করি না।”একবারের এই কথোপকথন রোমানের পুরো জীবন বদলে দেয়। পরে সে জানতে পারে, অবনীর হার্টে জন্ম থেকে একটা ছিদ্র ছিল। সে জানতো সে বেশিদিন বাঁচবে না। তাই কাউকে ভালোবাসতে চায়নি — কাউকে কষ্ট দিতে চায়নি। ভালোবাসা মানে আশা, আর তার জীবনে আশা ছিল না।কিন্তু রোমান তাকে ভালোবেসে ফেলে। তার মৃত্যুর পর (এক বছর পর ফেব্রুয়ারিতে) রোমান ভেঙে পড়ে। বড় ভাই ইমন আর ছোট বোন মীনা তাকে সামলায়। কিন্তু রোমান থামে না।সে অবনীর ‘চরিত্র’ খুঁজতে শুরু করে — যে মেয়ে ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না, কিন্তু ভেতরে ভালোবাসাকে অনেক বেশি সম্মান করে। সে পাগলের মতো খোঁজে। মাইকে করে ঢাকার রাস্তায় “অবনী তুমি কোথায়?” বলে ঘোরে, দশ টাকায় হৃদয়ের লটারির চিরকুট বিলি করে, বালিতে গিয়েও খোঁজে।বাসার বারান্দায় সে তিনটা গাছ লাগায় — সাদা পদ্ম, লাল গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা। প্রতিদিন এই গাছের সাথে অবনীর সাথে কথা বলে।বারো বছর পর, আরেক ফেব্রুয়ারিতে এক অচেনা মানুষ আশিকের সাথে কথা বলে রোমানের মনে শান্তি নামে। সে অবনীর গ্রামের কবর থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে এসে তার বারান্দার গাছে মিশিয়ে দেয়।এখন অবনী আর শুধু স্মৃতি নয় — সে তার বাগানে বেঁচে আছে।মূল : যে বলে “ভালোবাসায় বিশ্বাস করি না”, সে আসলে ভালোবাসাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় এবং সম্মান করে। আর যে একবারও ভালোবাসে, সে সারাজীবন ভালোবাসতে পারে — শরীর না থাকলেও।এটা একটা মায়াবী, দুঃখী কিন্তু খুব সুন্দর প্রেমের গল্প। যেখানে প্রেম শেষ হয় না, শুধু রূপ বদলায়।
0 Comments