প্রথম গল্প — যখন সকাল হবে (রোমান্টিক — একটি গল্পসংকলন )
প্রথম গল্প: যখন সকাল হবে “কিছু মানুষ দর্শন পড়ে বোঝে। কিছু মানুষ জীবন যাপন করে বোঝায়। বকুল দ্বিতীয় দলের।”— আশিক হাসান অক্টোবরের শেষে ছাগলনাইয়ায় কথা। বর্ষা সবে চলে গেছে। মাঠ তখনও একটু ভেজা, কিন্তু আকাশ পরিষ্কার। সকালের রোদে একটা সোনালি ভাব থাকে — যেন আলো সরাসরি পড়ছে না, বরং ভেসে আসছে। ফেনী নদীর শাখা যে এই উপজেলার পাশ দিয়ে গেছে, সেই পানিতে তখন আকাশের রঙ পড়ে — নীল না সাদা, মাঝামাঝি কিছু একটা।ভোর পাঁচটায় বকুল হোসেন তার বাড়ির উঠোনে আসে।পরনে ঢিলা হাফপ্যান্ট, পায়ে কিছু নেই। গায়ে একটা পুরনো সুতির গেঞ্জি — সাদা একসময় ছিল, এখন ধূসর। সে দরজা খুলে উঠোনে পা দেয়, খালি পায়ে মাটির স্পর্শ পায় — ঠান্ডা, একটু শিশির ভেজা।সে দাঁড়িয়ে থাকে।কিছু করে না। কিছু ভাবে না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।পুবের আকাশে তখন একটা কমলা আভা আসছে — কালো থেকে ধীরে ধীরে। প্রথমে বেগুনি, তারপর গোলাপি, তারপর কমলা। পেয়ারা গাছের মাথায় দুটো পাখি বসেছে, তারা ডাকছে — এক ধরনের পরিষ্কার, সরল শব্দ যেটা সাধারণভাবে থাকে না। বকুল এই দৃশ্য দেখে, চুপ করে।এই চুপ থাকাটা তার সবচেয়ে বড় রোমান্টিসিজম — কিন্তু সে জানে না। সে কখনো এটাকে নাম দেয়নি। সে শুধু জানে সকালে এখানে দাঁড়ালে ভেতরে কিছু একটা স্থির হয়। বাকি দিনটা তারপর চলে।বাড়িটা পুরনো পাকা। দেওয়ালে কোথাও কোথাও রঙ খসেছে, কিন্তু আত্মা মজবুত। সামনের বড় উঠোনে একটা পেয়ারা গাছ — বকুলের বয়সের চেয়ে পুরনো, ডালপালা ছড়িয়ে। উঠোনের এক পাশে একটা টিউবওয়েল, পাশে একটা নিমগাছ।বকুলের বাবা আলতাফ হোসেন একটু পরে আসেন — লুঙ্গি পরে, গায়ে গেঞ্জি, মাথায় একটু ঘুমের রেশ। তিনি ছেলের পাশে দাঁড়ান। কিছু বলেন না।বাবা-ছেলে দুজন চুপচাপ সকাল দেখে।এই পরিবারে ভালোবাসার ভাষা কথা নয়। পাশে থাকা।বকুল হোসেন আঠারো বছরের ছেলে।উচ্চতায় পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি — ছাগলনাইয়ার মানুষের মধ্যে একটু লম্বাই। শরীরে ফুটবলের পেশি — কাঁধ চওড়া, পা শক্ত। মুখে হালকা দাড়ির ছায়া, কিন্তু শেভ করার অভ্যাস নেই বিশেষ। চোখ দুটো কালো, সবসময় কিছু একটা দেখছে — মানুষ, পরিবেশ, পরিস্থিতি।সে কথা বলে কম।কিন্তু যখন বলে, সেটা ঠিক জায়গায় বলে।মাঠে বকুলকে দেখলে বোঝা যায় সে আলাদা। ছাগলনাইয়ার বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু সরে গেলে যে মাঠটা আছে — একটু অসমতল, উত্তর কোণে একটা বাঁক, বর্ষায় সেখানে পানি জমে — সেই মাঠে বিকেলে খেলা হয়।বকুল মিডফিল্ডে খেলে।মিডফিল্ড মানে সবকিছুর মাঝখানে থাকা। সামনে স্ট্রাইকার, পেছনে ডিফেন্ডার, মাঝখানে বকুল। সে দৌড়ায় — মাথা একটু নিচু, চোখ মাঠের সব জায়গায়। বল পেলে এক সেকেন্ড ধরে রাখে, মাঠ পড়ে, তারপর পাস দেয়।সে কখনো একলা গোল দিতে যায় না।তার বন্ধুরা বলে — “বকুলের পাস পেলে গোল না মারলে পাপ।”বকুল এই কথা শুনলে শুধু হাসে। ছোট হাসি, ঠোঁটের কোণে।সেই অক্টোবরে বকুল SSC দেবে।পড়াশোনায় সে মাঝারি — স্কুলের হিসেবে। কিন্তু তার নিজের হিসেবে সে জানে কোথায় শক্ত, কোথায় দুর্বল। জীব বিজ্ঞানে ভালো, রসায়নে মাঝারি, পদার্থবিজ্ঞানে অঙ্কটা ঝামেলা করে।ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন তার।এই স্বপ্ন সে কাউকে বড় গলায় বলে না। পরিবারে জানে, কিন্তু আলাদা করে ঘোষণা নেই। সে শুধু জানে এটা হবে।একদিন বিকেলে মাঠ থেকে ফিরছিল।শরীরে ঘাম, হাঁটুতে একটু কাদা — বর্ষার শেষে মাঠের এক কোণে এখনও কাদা। পরনে নীল ট্র্যাকপ্যান্ট আর সাদা গেঞ্জি। পায়ে ঘাসে ভেজা কেডস।বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটা নতুন ব্যানার।সবুজ কাপড়ে সাদা হরফে — “আরাফাত কোচিং সেন্টার। SSC বিজ্ঞান বিশেষ ব্যাচ।”সে দাঁড়াল। পড়ল। একটু ভাবল।পরেরদিন সকালে বাবাকে বলল।বাবা এক মুহূর্ত দেখলেন।“ভর্তি হ।”এটুকুই।নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ।কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছে বকুল। প্রতিদিন সকালে যায়।বাসস্ট্যান্ড থেকে হেঁটে মিনিট দশেক। পথে একটা সরু গলি পড়ে — দুই পাশে টিনের বেড়া, মাঝখানে মাটির পথ। এই গলি দিয়ে গেলে একটু সময় বাঁচে।সেদিন সকালে — আকাশে পাতলা মেঘ, রোদ আছে কিন্তু তীব্র নয়, বাতাসে শীতের হালকা আভাস — বকুল গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়েকে দেখল।সুইটি।পাড়ার মেয়ে। সুমাইয়া আক্তার আসল নাম, কিন্তু সবাই সুইটি বলে ডাকে।গোলগাল মুখ, ছোট নাক, হাসলে গালে একটা টোল পড়ে। সেদিন পরনে ছিল ছাই রঙের সালোয়ার কামিজ, মাথায় সাদা ওড়না ঢিলা করে দেওয়া। হাতে স্কুলের বই।পাশে আরেকটা মেয়ে — ওর বান্ধবী।সুইটি বকুলকে দেখে বলল, “বকুল ভাই, কোথায় যাচ্ছ এত সকালে?”বকুল থামল। “কোচিং।”“কোন কোচিং?”“আরাফাত। মোড়ের পাশে।”“ভালো পড়ায়?”“হ্যাঁ। প্রথমদিন গেলাম, বায়োলজিতে অনেক কিছু বুঝলাম যেটা স্কুলে বুঝিনি। তুমিও ভর্তি হও। পরীক্ষা কাছে।”সুইটি তার বান্ধবীর দিকে একবার তাকাল।“ঠিক আছে।”বকুল হাঁটতে লাগল।পেছনে সুইটি তার বান্ধবীকে কিছু একটা বলছিল — বকুল শুনতে পায়নি।এই ছিল সেই এক মিনিটের কথা।বকুল তখন জানত না — এই এক মিনিটে সে সুইটির জীবনের একটা অধ্যায়ের দরজা খুলে দিয়েছে। আর সেই দরজা দিয়ে কে ঢুকবে, কী হবে — সেটা সম্পূর্ণ আলাদা গল্প।কোচিং সেন্টারটা বাসস্ট্যান্ড থেকে ডানে মোড় নিয়ে একটু সামনে।দোতলা পুরনো বিল্ডিং। নিচতলায় দুটো ঘর। সামনের ঘরটা বড় — লম্বালম্বি, দুই পাশে জানালা। বেঞ্চ সারি সারি, সামনে সবুজ বোর্ড। সিলিংয়ে একটা পুরনো ফ্যান ঘোরে, কিন্তু শব্দ করে। দেওয়ালে সাবেক ছাত্রছাত্রীদের ছবি — হাতে সনদ, মুখে হাসি, পাশে GPA লেখা।পেছনের ঘরটা ছোট। একটা টেবিল, দুটো চেয়ার। শিক্ষকরা মাঝেমাঝে বসেন, মাঝেমাঝে আলাদা ক্লাস হয়।সুইটি এলো দ্বিতীয় সপ্তাহে।সেদিন বাইরে হালকা বৃষ্টি ছিল — নভেম্বরের শেষ বৃষ্টি, পাতলা ধারা, বেশিক্ষণ থাকে না। সুইটি ক্লাসে ঢুকল ওড়নাটা একটু ভেজা করে — দৌড়ে আসতে হয়েছে। নীল সালোয়ার কামিজ, হাতে একটা নতুন নোটবুক।সে দরজায় দাঁড়াল একটু — নতুন জায়গার অস্বস্তি, চোখ ঘুরে দেখছে।জুয়েল স্যার বললেন, “আসো।”সুইটি সামনের সারিতে বসল।বকুল তখন তৃতীয় সারিতে — জানালার পাশে। জানালা দিয়ে বাইরে বৃষ্টির ধারা দেখা যাচ্ছিল।সে মুখ ঘুরাল।সুইটিকে দেখল।তারপর জানালার দিকে তাকাল।তারপর আবার সুইটির দিকে।সুইটি তখন নোটবুক খুলছে। তার হাতের লেখা — বকুল কীভাবে দেখল কে জানে — গোলগাল। সে লেখার সময় মাথা একটু কাত করে। ঠোঁটটা একটু ভেতরে টানে।বকুল এই জিনিসগুলো দেখল।সংগ্রহ করল।নাম দিল না।ক্লাস শেষে বের হওয়ার সময় সুইটি তার পাশে দিয়ে যাচ্ছিল। থামল।“তুমি এখানে?”“হ্যাঁ।”“কেমন লাগল?”“একটু কঠিন। অনেক কিছু একসাথে।”বকুল বলল, “কয়েকদিন পরে ঠিক হবে।”সুইটি হাসল।গালে টোল।বকুল দেখল।তারপর বলল, “আসি।”বাড়ি ফিরে সে পড়তে বসল।কিন্তু মাথার কোথাও একটা গোলগাল হাতের লেখার ছবি ছিল।জুয়েল আহমেদ।সাতাশ বছর। ছাগলনাইয়ারই ছেলে।মাঝারি উচ্চতা, চিকন গড়ন। সবসময় পরিপাটি থাকে — ইস্ত্রি করা শার্ট, চুল আঁচড়ানো। কোচিংয়ে আসার আগে বাথরুমের আয়নায় একবার নিজেকে দেখে নেয়।এই দেখে নেওয়াটা অভ্যাস। কিন্তু এর পেছনে একটা গল্প আছে।জুয়েল একসময় ভালো ছাত্র ছিল। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে HSC, তারপর ঢাকায় একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। স্বপ্ন ছিল — ইঞ্জিনিয়ার হবে, ব্রিজ বানাবে, রাস্তা বানাবে। কিছু একটা বানাবে যেটা মানুষ দেখবে।তৃতীয় বর্ষে বাবার হার্টের সমস্যা।অপারেশন।টাকা শেষ।জুয়েল পড়া ছেড়ে টিউশনি শুরু করল। তারপর একটা পর্যায়ে পড়াও বন্ধ হয়ে গেল।সে গ্রামে ফিরে এলো।তৃতীয় বর্ষে অসম্পূর্ণ ডিগ্রি নিয়ে।এই ফেরাটা তার ভেতরে একটা ক্ষত তৈরি করেছে যেটা বাইরে দেখা যায় না। সমবয়সীরা এখন প্রতিষ্ঠিত — কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ব্যাংকে, কেউ বিদেশে। জুয়েল কোচিং পড়ায়।মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা।কিন্তু পড়ানোতে একটা দক্ষতা আছে তার — সে বোঝাতে পারে। জটিল বিষয়কে সহজ করে বলে, উদাহরণ দেয়।রাতে একা শুয়ে একটা প্রশ্ন আসে — আমি কি এটার জন্যই জন্মেছিলাম?উত্তর পায় না।সুইটি যখন প্রথমবার তার কাছে প্রশ্ন নিয়ে এলো — নভেম্বরের এক বিকেলে, ক্লাস শেষে, বাইরে তখনও আলো আছে — জুয়েল বোঝাল স্বাভাবিকভাবে।সুইটি বলল, “স্যার, আপনি এত সহজে বোঝান।”জুয়েল তার দিকে তাকাল।সুইটি তখন বই হাতে দাঁড়িয়ে, সন্ধ্যার আলোতে, মুখে একটা সরল প্রশংসা।জুয়েলের ভেতরে কোথাও কিছু নড়ে উঠল।কতদিন কেউ তাকে এইভাবে বলেনি।সে বলল, “আরো প্রশ্ন থাকলে আসতে পারো।”সুইটির বাড়ি কোচিং থেকে আধা কিলোমিটার।গলির ভেতরে। মাথায় একটা বড় বটগাছ — ঝুরি নেমেছে মাটি পর্যন্ত, শীতের বিকেলে এর ছায়া লম্বা হয়।বাড়িটা পুরনো। দেওয়ালে ছাঁচ পড়েছে কোথাও কোথাও। সামনে একটা ছোট উঠোন, মাঝখানে একটা তুলসী গাছ।বাবা মফিজুল হক সরকারি অফিসে চাকরি করেন। সকালে বের হন, সন্ধ্যায় ফেরেন। ফিরে টেলিভিশনের সামনে বসেন। রাতে খান। ঘুমান।সুইটির সাথে কথা — “পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে?”“হ্যাঁ।”“আচ্ছা।”শেষ।মা রাহেলা বেগম একটু বেশি কথা বলেন। কিন্তু সেটা সব সংসারের কথা। রান্নার কথা, বাজারের কথা, পাড়ার কথা।সুইটির মনের কথা — কেউ জিজ্ঞেস করে না।সুইটির একটা ছোট ভাই আছে, স্কুলে পড়ে, নিজের জগতে থাকে।সুইটির ঘর ছোট। একটা খাট, একটা পড়ার টেবিল, একটা আলমারি। জানালা দিয়ে উঠোন দেখা যায়। সন্ধ্যায় সে এই জানালায় বসে থাকে মাঝেমাঝে — বাইরে অন্ধকার নামছে, পাড়ায় ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে।সে মোবাইলে গান শোনে। ফেসবুকে ছবি দেয়। লাইক পায়।কিন্তু এই লাইক — এই ডিজিটাল মনোযোগ — সেই অভাবটা পূরণ করে না।অভাবটা কীসের?কেউ তার দিকে তাকিয়ে থাকুক। সত্যিকারের। শুধু মুখের দিকে না, তার মুখের পেছনে যা আছে তার দিকেও।জুয়েল স্যার যখন তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন — সুইটির ভেতরে একটা উষ্ণতা এলো যেটা সে আগে পায়নি।সে জানত এটা শিক্ষক-ছাত্রীর সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু সে থামেনি।থামার শক্তি আসে ভেতর থেকে। ভেতরটা শক্ত হয় যখন কেউ বলে — তুমি নিজেই যথেষ্ট। সুইটিকে কেউ বলেনি।ডিসেম্বরের শুরু।শীত এসে গেছে ছাগলনাইয়ায়। সকালে কুয়াশা থাকে — পাতলা, কিন্তু আছে। বিকেলে রোদ নামে তাড়াতাড়ি।কোচিংয়ের পেছনের ছোট ঘরে বিকেলের পর আলো কম। একটা বাল্ব জ্বলে। দুটো চেয়ার, একটা টেবিল।সুইটি আর জুয়েল।প্রথম দুই সপ্তাহ পড়াই হলো। সত্যিকারের পড়া — বায়োলজির অধ্যায়, রসায়নের সূত্র।কিন্তু পড়ার ফাঁকে কথা হতে লাগল।একদিন সুইটি বলল, “স্যার, আমার বাসায় কেউ কথা বলে না বিশেষ।”জুয়েল বলল, “কেন?”“জানি না। সবাই নিজের মতো।”জুয়েল একটু চুপ করে রইল। বাইরে তখন শীতের সন্ধ্যা নামছে, পাড়ায় কোথাও থেকে রান্নার গন্ধ আসছে।“আমিও অনেকটা এরকম। বাবা অসুস্থ, মা ব্যস্ত। আমার কথা শোনার কেউ নেই।”সুইটি তার দিকে তাকাল।এই তাকানোতে একটা সংযোগ তৈরি হলো।দুটো একাকী মানুষের মধ্যে।জুয়েল বুঝেছিল সে কোথায় যাচ্ছে।কিন্তু থামেনি।কারণ এই সংযোগটা তার কাছে একটা জয়ের মতো ছিল। অনেকদিন সে কিছু পায়নি। এখন পাচ্ছে — একজন মানুষের মনোযোগ, একজনের বিশ্বাস।ধীরে ধীরে দূরত্ব কমল।পড়া কমল, কথা বাড়ল।সুইটি প্রতিদিন আসত। শীতের বিকেলে, মাফলার গলায় পেঁচিয়ে, নাক লাল করে।সে জানত সে কোথায় যাচ্ছে।কিন্তু উষ্ণতার দিকে হাঁটা বন্ধ করার কথা মাথায় আসছিল না।জানুয়ারি।শীত এখন পুরোদমে। সকালে ঘন কুয়াশা — দশ হাত সামনে দেখা যায় না। বিকেলে রোদ ওঠে কিছুক্ষণের জন্য, তারপর আবার ঠান্ডা।একদিন বিকেলে বকুল মাঠ থেকে ফিরছিল।পরনে নেভি ব্লু ট্র্যাকস্যুট, পায়ে কেডস। মাঠের কাদা লেগে আছে পায়ে। হাতে পানির বোতল।কোচিংয়ে একটু দেরিতে আসছিল, মূল দরজায় ভিড় — কয়েকজন ছেলে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। বকুল পাশের গলি দিয়ে ঢুকতে গেল।গলিটা সরু, দুই পাশে দেওয়াল।হাঁটতে হাঁটতে জানালায় চোখ পড়ল।আলো জ্বলছে পেছনের ঘরে।বকুল এক সেকেন্ড দেখল।সুইটি বসে আছে। জুয়েল স্যার পাশে। বই খোলা নেই। কথা হচ্ছে। জুয়েল স্যারের হাত টেবিলে — সুইটির হাতের খুব কাছে।বকুল হাঁটতে লাগল।ক্লাসে ঢুকে বসল তার জায়গায়।বই বের করল।কলমটা হাতে নিল।শুরু করতে পারল না।সে বুঝল না এই না পারার কারণ। একটা ভার আছে বুকে — কীসের ভার? সে তো কিছু হারায়নি। কোনো কিছু তার ছিল না।হ্যাঁ। ছিল না।কিন্তু মনের ভেতরে যা ছিল?সে একটা মুখ নিয়ে একটা গল্প লিখেছিল। সেই গল্পে শুধু সে ছিল, আর একটা হাসি ছিল, আর একটা গোলগাল হাতের লেখা ছিল।সেই গল্পটা এইমাত্র শেষ হলো।ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরল বকুল।সন্ধ্যা তখন নেমেছে। আকাশ একটা গাঢ় নীল, পশ্চিমে হালকা কমলা রেখা। ঠান্ডায় নিঃশ্বাস নিলে ধোঁয়া বের হয়।রাস্তার পাশে রনি বসেছিল — পাড়ার ছেলে, ফুটবল বন্ধু।“কী রে বকুল? মুখ অন্ধকার কেন?”“কিছু না।”“বস একটু।”বকুল বসল।রনি পকেট থেকে সিগারেট বের করল।“নিবি?”বকুল আগে কখনো খায়নি। ফুটবল খেলে, শরীর ঠিক রাখে, সিগারেট তার রুটিনে নেই।কিন্তু সেই মুহূর্তে সে বলল, “দে।”রনি অবাক হলো।“তুই?”“দে।”রনি দিল।বকুল ধরাল।প্রথম টান — ধোঁয়া গলায় নামল, কাশল তীব্রভাবে। চোখ জ্বলে উঠল। রনি হাসল।বকুল থামল না।দ্বিতীয় টান।এবার কম কাশল।সে ধোঁয়া ছাড়ল।ঠান্ডা বাতাসে সেই ধোঁয়া মিলিয়ে গেল।সে বুঝল — ভার যায়নি। শুধু একটু ঝাপসা হয়েছে।ঝাপসা হলে ব্যথা কমে না, শুধু দেখা কমে।সে সিগারেট ফেলে দিল।রনি বলল, “শেষ করলি না?”“না।”উঠে চলে গেল।বাড়ি ফিরে সে পড়তে বসল।রাত বারোটা পর্যন্ত পড়ল।পরেরদিন থেকে রুটিন আরো শক্ত করল।এটাই ছিল বকুলের প্রায়শ্চিত্ত — পড়া।মার্চ।পরীক্ষার মৌসুম।বকুলের রুটিন এখন লোহার মতো শক্ত। ভোর পাঁচটায় উঠা — ঘরে তখনও অন্ধকার, বাইরে কুয়াশা পাতলা হচ্ছে। সে মুখ ধুয়ে, এক গ্লাস পানি খেয়ে, পড়ার টেবিলে বসে।টেবিলের সামনে একটা কাগজ দেওয়ালে আটকানো — দিন বিভাগ করা। কোন সময়ে কী পড়বে।পরীক্ষার হলে বকুল শান্ত।এই শান্তটা সে মাঠ থেকে শিখেছে। মাঠে যখন বড় ম্যাচ হয় — প্রতিপক্ষ শক্তিশালী, দর্শক চিৎকার করছে — বকুল তখনও একটা কেন্দ্রে থাকে। বল পায়, পড়ে, পাস দেয়।পরীক্ষার হলে সে প্রশ্নপত্র পেয়ে প্রথমে পুরোটা পড়ে নেয়। হিসাব করে — কতটা সহজ, কতটা কঠিন, সময় কত লাগবে। তারপর শুরু করে।দশটা পরীক্ষা।ফলাফল।বকুল — GPA ৪.৫০।সে রেজাল্ট দেখে বাবাকে ডাকল।বাবা দেখলেন।“ভালো।”মা এলেন।“চা বানাই।”এটুকুই।কিন্তু এই “ভালো” আর এই চায়ের প্রস্তাবে যা আছে — সেটা অনেক কিছু। একটা পরিবারের নীরব গর্ব।সুইটির ফলাফল — GPA ৩.৭৫।জুয়েল স্যারের বিশেষ সময় পরীক্ষার হলে কাজ করেনি। কারণ পড়ার সময় যে কথায় কাটছিল, পরীক্ষার হলে শুধু পড়াটাই থাকে।জুন মাস।ঢাকায় গরম তখন তীব্র। রাস্তার পিচ গলে না ঠিক, কিন্তু পায়ের নিচে গরম লাগে। বাস থেকে নামলে একটা গরম বাতাসের ঢেউ মুখে আসে।বকুল বাস থেকে নামল গুলিস্তানে।পরনে ধূসর প্যান্ট, সাদা শার্ট, পায়ে স্যান্ডেল। পিঠে একটা বড় ব্যাগ — কাপড়, বই, বাবা-মায়ের ছবির একটা ছোট ফ্রেম।ছাগলনাইয়া থেকে ঢাকা — এই দূরত্বটা শুধু কিলোমিটারে নয়।রিকশায় বাড্ডা গেল।বাড্ডার গলি। পাঁচতলা পুরনো বিল্ডিং। তৃতীয় তলায় ফ্ল্যাট।বাড়িওয়ালা একজন মধ্যবয়সী মানুষ — লুঙ্গি পরা, হাতে চায়ের কাপ।“তুমি নতুন?”“হ্যাঁ।”“কোথা থেকে?”“নোয়াখালী। ছাগলনাইয়া।”বাড়িওয়ালা একটু হাসলেন। “ভালো জায়গা। আমার মামার বাড়ি ফেনীতে।”ঘরে ঢুকল বকুল।ছোট ঘর। দুটো বেড, একটা টেবিল। ফ্যান ঘুরছে। জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির দেওয়াল দেখা যায়।সে ব্যাগ রাখল।বসল।বাইরে ঢাকার শব্দ আসছে — রিকশার ঘণ্টা, হর্ন, কোথাও থেকে মাইকে গান।এই শহরে সে একা।কিন্তু ভয় লাগেনি।কেমব্রিয়ান কলেজ।গুলশান ২-এ। বাড্ডা থেকে রিকশায় মিনিট পনেরো।প্রথমদিন গেটে দাঁড়িয়ে বকুল দেখল — কালো পোশাকের স্রোত।কালো প্যান্ট, কালো শার্ট, কালো সালোয়ার কামিজ।গুলশানের পরিষ্কার রাস্তায় এই কালো পোশাকের মানুষগুলো হাঁটছে — একটা শৃঙ্খলা আছে, একটা একতা আছে।বকুল ভাবল — এখানে ধনী-গরিব বোঝা যায় না। শার্টের দামের পার্থক্য দেখা যায় না। সবাই কালো।এটা তার ভালো লাগল।সে ভেতরে ঢুকল।কেমব্রিয়ানে বকুল বন্ধু বানাল।এটা তার একটা বিশেষ ক্ষমতা — নতুন জায়গায় সে মানুষকে দেখে, বোঝে, তারপর নিজের জায়গা খোঁজে।তূর্য— চট্টগ্রামের ছেলে। সবসময় হেডফোন কানে। পদার্থবিজ্ঞানে অসাধারণ। বকুলের সাথে প্রথম কথা হয়েছিল লাইব্রেরিতে — তূর্যএকটা বই খুঁজছিল, বকুল দেখাল।তানভীর — বাড্ডারই ছেলে। মাঠে ফুটবল খেলে। বকুলকে দেখে প্রথম দিনেই বলল, “তুমি কি খেলো?”বকুল বলল, “হ্যাঁ।”“কোন পজিশন?”“মিড।”“আমিও। চলো একদিন।”শ্রেয়া — সিলেটের মেয়ে। বায়োলজিতে ভালো। বকুলকে একদিন বায়োলজির একটা জিনিস জিজ্ঞেস করেছিল, বকুল বুঝিয়ে দিয়েছিল। তারপর থেকে মাঝেমাঝে পড়ার কথা হয়।এই মানুষগুলো বকুলের ঢাকার জীবনকে রঙিন করেছিল।মেসে পাশের বেডে আশিক।আশিক হাসান। গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলা। গজারিয়া গ্রামে বাড়ি — ভাওয়াল রাজবাড়ীর কাছে।মধ্যম উচ্চতা, গোলগাল মুখ, মোটা ফ্রেমের চশমা। সবসময় হাসি ঝুলে মুখে — বড়, প্রকাশ্য হাসি।প্রথমদিন পরিচয়।বকুল ব্যাগ রাখছিল। আশিক বিছানায় হেলান দিয়ে বই পড়ছিল — পায়ে স্লিপার, পরনে হাফপ্যান্ট আর একটা ঢিলা টি-শার্টে লেখা “READ MORE BOOKS।”আশিক বই নামিয়ে তাকাল।“নতুন?”“হ্যাঁ।”“কোথা থেকে?”“ছাগলনাইয়া।”আশিক চশমার উপর দিয়ে তাকাল।“ছাগলনাইয়া?” একটু থামল। “মিয়া, এই নামটা কীভাবে হলো?”“জানি না। আসল নাম।”“ঐতিহাসিক।” আশিক হাসল। “আমি শ্রীপুর। গাজীপুর। ভাওয়াল রাজবাড়ীর কাছে।”“জানি ভাওয়াল।”“তাহলে জানিস সেই রাজার গল্প — যে মরে গিয়েও ফিরে এসেছিল?”“কথিত আছে।”“কথিত আছে মানে বিশ্বাস করিস না?”“জানি না।”আশিক বলল, “আমি বিশ্বাস করি। কারণ আমি মনে করি মানুষ কখনো সত্যিকার মরে না যদি তার গল্প থাকে।” সে বই তুলল। “তোর নাম কী মিয়া?”“বকুল।”“আমি আশিক। বন্ধু হবি?”বকুল একটু দেখল।“হবে।”আশিক অন্যরকম মানুষ।সে বই পড়ে — অনেক। ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান। কিন্তু পড়া তার কাছে আনন্দের — পরীক্ষার জন্য নয়।ভাওয়াল রাজবাড়ীর পাশে বড় হয়েছে, কাছেই একটা পুরনো লাইব্রেরি ছিল — সেখানে বসে পড়ত। রুমি, অ্যারিস্টটল, নিটশে, রবীন্দ্রনাথ, ওমর খৈয়াম — এই মানুষগুলো তার মাথায় বাস করে।কিন্তু আশিক দার্শনিক ভঙ্গিতে কথা বলে না।সে সহজ ভাষায় বলে।হাসতে হাসতে বলে।এবং সে মানুষ পড়তে পারে — একজন মানুষকে দেখে বলতে পারে তার ভেতরে কী চলছে।বকুলকে দেখে সে প্রথম সপ্তাহেই অনেক কিছু বুঝেছিল।জুলাই।বৃষ্টির মৌসুম।সেদিন রাতে বৃষ্টি ছিল না, কিন্তু বাতাসে ভেজা গন্ধ। আকাশে মেঘ, মাঝে মাঝে চাঁদ দেখা যাচ্ছে।পড়া শেষে আশিক বলল, “মিয়া, ছাদে চল।”বকুল তখন জামা পরছিল — ঘুমানোর আগে একটু হাঁটবে ভেবেছিল।“কী দরকার?”“বাতাস খেতে। পাঁচ মিনিট।”ছাদে গেল।বাড্ডার ছাদ থেকে চারদিকে বাড়ি। দূরে গুলশানের উঁচু ভবনগুলো আলোকিত। নিচের রাস্তায় রিকশার ঘণ্টা আসছে।আশিক রেলিঙে হেলান দিল।বকুল পাশে দাঁড়াল।বাতাস আসছে — একটু ঠান্ডা, একটু ভেজা।আশিক বলল, “মিয়া, তোকে একটা কথা বলি।”“বল।”“তুই একটা অদ্ভুত মানুষ।”বকুল বলল, “কেন?”“কারণ তুই মেসে এসে সবার সাথে মিশলি — রাফি, তানভীর, শ্রেয়া — কিন্তু কাউকে পুরোটা দিলি না।”বকুল বলল, “এটা কি সমস্যা?”“না। কিন্তু কারণটা জানতে চাই।”বকুল একটু থামল। নিচের রাস্তায় একটা রিকশা যাচ্ছে, চালক গাইছে।“কারণ আমি বিশ্বাস করি মানুষকে পুরোটা দিলে পুরোটা নিয়ে যায়।”“কে শিখিয়েছে?”“জীবন।”আশিক বলল, “কোন জীবনের কথা বলছিস?”বকুল চুপ করে রইল।আশিক অপেক্ষা করল। সে জানে — বকুল বলবে। সময় লাগে।তারপর বকুল বলল, “কেউ ছিল।”“মেয়ে?”“হ্যাঁ।”“নাম?”“সুইটি।”আশিক বলল, “কী হয়েছিল?”বকুল বলল, “কিছু হয়নি। সেটাই হলো কথা। সে জানত না আমার মনে কী ছিল। আমি দূর থেকে দেখতাম। কথা হয়েছে দুই-তিনবার — পড়ার কথা।”“তারপর?”“তারপর দেখলাম সে কোচিংয়ের শিক্ষকের সাথে জড়িয়ে পড়েছে।”আশিক একটু থমকাল।“স্যারের সাথে?”“হ্যাঁ।”“তখন?”“সিগারেট খেলাম।”আশিক হাসল।“মিয়া তুই সিগারেট?”“একবার। কাশলাম, ফেলে দিলাম।”“এইটাই তোর রেবেলিয়ন?”“এইটাই।”দুজনেই হাসল।তারপর আশিক গম্ভীর হলো।সে বলল, “মিয়া, তুই জানিস তুই কী করেছিলি?”“কী?”আশিক বলল, “Stoic দার্শনিকরা — মার্কাস অরেলিয়াস, এপিকটেটাস — এরা বলতেন: যে জিনিস তোমার নিয়ন্ত্রণে নেই, তা নিয়ে ভেবো না। শুধু যা তোমার হাতে আছে, সেটা করো।”বকুল বলল, “আমি এটা পড়িনি।”“পড়িসনি, কিন্তু করেছিস।” আশিক তার দিকে তাকাল। “সুইটি তোর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তুই সেটা বুঝেছিলি — হয়তো পুরোপুরি না, কিন্তু একটা সময়ে ছেড়ে দিয়েছিলি। তারপর পড়া শুরু করেছিলি।”বকুল বলল, “আমি সেভাবে ভাবিনি।”“ঠিক আছে।” আশিক হাসল। “তুই ভাবিসনি। কিন্তু করেছিস। মার্কাস অরেলিয়াস সারাজীবন রোম সম্রাজ্য চালিয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন — কিন্তু রাতে ডায়েরি লিখতেন। নিজের দুর্বলতা নিজে স্বীকার করতেন। তারপর আবার উঠতেন।”“তুই আমার সাথে সম্রাটের তুলনা করছিস?”“না মিয়া। তুলনা করছি মিডফিল্ডারের।” আশিক হাসল। “সম্রাট পড়লে মনে হয় দূরের মানুষ। মিডফিল্ডার — সেটা তুই।”বকুল বলল, “এই দার্শনিক কথাগুলো কোথা থেকে শিখলি?”“ভাওয়ালের লাইব্রেরি থেকে।” আশিক হাসল। “গ্রামে মোবাইল নেটওয়ার্ক ভালো না ছিল। বই পড়তাম।”বকুল হাসল।“মিয়া, তুই একটা অদ্ভুত মানুষ।”“এইটা তুইও বললি। সবাই বলে।”একটু চুপ।তারপর আশিক বলল, “আরেকটা কথা।”“বল।”“সুইটি কেন সেই স্যারের সাথে গেল — তুই কি ভেবেছিস?”বকুল বলল, “ভেবেছি। সে একাকী ছিল। মনোযোগ চাইছিল।”“হ্যাঁ।” আশিক একটু থামল। আকাশে মেঘ সরে চাঁদ দেখা গেল। “রুমি একটা কথা বলেছিলেন — ‘তোমার ক্ষত হলো সেই জায়গা যেখান দিয়ে আলো ঢোকে।’ সুইটির ক্ষত ছিল একাকীত্ব। কিন্তু সে সেই ক্ষতে যে আলো ঢোকাল, সেটা সত্যিকারের আলো ছিল না।”বকুল বলল, “তুই কি জানিস সুইটির পরে কী হয়েছে?”“না। কিন্তু অনুমান করতে পারি।”“কী অনুমান?”আশিক বলল, “যে মানুষ শর্টকাটে উষ্ণতা খোঁজে, সে উষ্ণতা পায়। কিন্তু সেটা বেশিদিন থাকে না। কারণ শর্টকাটে যা পাওয়া যায় তার শিকড় নেই।”বকুল চুপ করে রইল।তারপর বলল, “তুই দার্শনিক।”“না মিয়া। আমি পর্যবেক্ষক।” আশিক হাসল। “তুই দার্শনিক।”“আমি দার্শনিক না।”“তুই জানিস না। কিন্তু তোর জীবন যাপনই একটা দর্শন।”বকুল বলল, “কেমন?”আশিক বলল, “অ্যারিস্টটল বলেছিলেন — সর্বোচ্চ সুখ হলো নিজের সেরাটা দেওয়া। Eudaimonia — মানে সমৃদ্ধ জীবন। শুধু আনন্দ নয়, অর্থপূর্ণ জীবন। তুই মাঠে পাস দিস কারণ পাসটাই তোমার সেরা কাজ। তুই পড়িস কারণ ডাক্তার হওয়াটাই তোমার সেরা হওয়া। এটা দর্শন — তুই জানিস না, কিন্তু করিস।”বকুল একটু ভাবল।“তুই এই দার্শনিকদের কথা বলিস, কিন্তু নিজে?”আশিক বলল, “আমার দর্শন সহজ।”“কী?”“সক্রেটিস বলতেন — সবচেয়ে বড় জ্ঞান হলো জানা যে আমি জানি না।” আশিক হাসল। “আমি কিছু জানি না মিয়া। কিন্তু প্রশ্ন করতে পারি। আর হাসাতে পারি।”“হাসানো কি দর্শন?”“সক্রেটিসের কথা মনে করিস। তিনি সারাজীবন প্রশ্ন করে বেড়িয়েছেন। কিন্তু কথা বলতেন হাসিমুখে। গুরুগম্ভীর ছিলেন না।” আশিক বলল, “আমি মনে করি — একজন মানুষ যদি তোমার কারণে সত্যিকার হাসে, সেটা পৃথিবীকে একটু ভালো করে।”বকুল বলল, “এটা তোর নিজের দর্শন?”“হ্যাঁ। আশিক হাসান, গজারিয়া গ্রাম, শ্রীপুর, গাজীপুর।”দুজনেই হাসল।নিচে রাস্তায় রিকশার ঘণ্টা বাজল।এরমধ্যে খবর এলো।রিয়াদ ফোন করল — ছাগলনাইয়ার বন্ধু।“মিয়া বকুল, সুইটির বিয়ে হয়ে গেছে।”“কার সাথে?”“জুয়েল স্যারের সাথে।”বকুল ফোনটা হাতে ধরে রইল।বাইরে তখন ঢাকার সন্ধ্যা। মেসের ঘরে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে। ফ্যান ঘুরছে।“ঠিক আছে।”“ঠিক আছে মানে? কিছু মনে হচ্ছে না?”“না।”“বাজে কথা।”“রিয়াদ, পড়তে বস।”ফোন রাখল।সে একটু বসে রইল।তারপর আশিকের ঘরে গেল।আশিক বই পড়ছিল — পা ছড়িয়ে বিছানায়, হাতে একটা পুরনো বই, পাতার রঙ হলুদ হয়ে গেছে।বকুল বলল, “মিয়া।”আশিক মুখ তুলল।বকুলের মুখ দেখে বই রাখল।“কী হয়েছে?”“সুইটির বিয়ে হয়ে গেছে। সেই স্যারের সাথে।”আশিক একটু থামল।তারপর বলল, “আয়। বস।”বকুল বসল।আশিক বলল, “কেমন লাগছে?”“জানি না।”“জানিস, কিন্তু বলতে পারছিস না।”বকুল বলল, “একটু খারাপ।”“স্বাভাবিক।” আশিক বলল, “নিটশে বলেছিলেন — Was mich nicht umbringt, macht mich stärker। যা তোমাকে ধ্বংস করে না, সেটা তোমাকে শক্তিশালী করে।”বকুল বলল, “এটা কি সুইটির কথায় মিলে?”“মিলে।” আশিক বলল, “তুই ধ্বংস হসনি। একটু কষ্ট পেয়েছিস — এখনো পাচ্ছিস। কিন্তু এই কষ্ট তোকে শেষ করবে না। বরং একটা সময় দেখবি এটাই তোকে আরো শক্ত করেছে।”বকুল বলল, “তুই কি নিটশে পড়িস?”“পড়ি। কিন্তু নিটশের সব কথা মানি না।” আশিক হাসল। “নিটশে মাঝে মাঝে বেশি নাটকীয়। আমি বলব — দোস্তয়েভস্কির কথা বেশি মিলে।”“দোস্তয়েভস্কি?”“রুশ লেখক। তিনি বলতেন — কষ্ট মানুষকে মানুষ করে। কষ্ট ছাড়া গভীরতা নেই।” আশিক বলল, “তুই এখন যে কষ্টটা পাচ্ছিস — এটা তোকে একটু গভীর করছে। এই গভীরতা একদিন কাজে লাগবে।”বকুল বলল, “কীভাবে?”“জানি না। কিন্তু লাগবে।”একটু নীরবতা।তারপর আশিক বলল, “মিয়া, পড়তে বস।”বকুল উঠল।“আচ্ছা।”“কাল সকালে ঠিক হয়ে যাবে।”বকুল বলল, “তুই কীভাবে জানিস?”“কারণ তুই সেই মানুষ যে সকালে উঠোনে দাঁড়ায়।” আশিক হাসল। “যে মানুষ সকালের আলো দেখে — সে রাতে ডুবে থাকে না।”বকুল তার দিকে তাকাল।“তুই এটা কোথায় পড়েছিস?”“কোথাও না।” আশিক হাসল। “এটা আমি তোকে দেখে বুঝেছি।”HSC ফলাফল।বকুল — GPA ৫।আশিক — GPA ৪.৮৩।সেদিন রাতে ছাদে বসল দুজনে।আগস্টের রাত। একটু ঠান্ডা বাতাস। আকাশে মেঘ পাতলা হয়েছে, মাঝে মাঝে তারা দেখা যাচ্ছে।আশিক বলল, “মিয়া, তুই GPA ৫ পেলি।”“তুইও ভালো করেছিস।”“কিন্তু তোর মতো না।” আশিক বলল, “কারণ তুই সেই মানুষ যে যা বলে তাই করে।”বকুল বলল, “তুইও করেছিস।”“কিন্তু আমি এখন ময়মনসিংহে যাব। বাড়িতে যাব প্রথমে — শ্রীপুরে। মা-বাবাকে দেখব। তারপর মেডিকেলের চেষ্টা করব।”“কবে যাবি?”“পরশু।”একটু নীরবতা।আশিক বলল, “তুই একা থাকতে পারবি মিয়া?”“পেরেছি এতদিন।”“এতদিন আমি ছিলাম।”বকুল তার দিকে তাকাল।“তুইও ছিলিস।”আশিক হাসল।“তুই কৃতজ্ঞ কিন্তু বলবি না।”“হ্যাঁ।”পরশু সকালে আশিক ব্যাগ নিয়ে নামছিল।সিঁড়িতে বকুল দাঁড়িয়ে।আশিক বলল, “মিয়া, একটা কথা।”“বল।”“আলবেয়ার কামু বলেছিলেন — জীবন অর্থহীন হতে পারে, কিন্তু তারপরও এটাকে ভালোবাসতে হয়। বিদ্রোহ করতে হয় অর্থহীনতার বিরুদ্ধে।”“তুই এখন কামু টানলি কেন?”“কারণ তুই মেডিকেলে চান্স না পেলে ভাঙবি। আবার উঠবি।” আশিক বলল, “কামুর সেই বিখ্যাত কথা মনে রাখিস — One must imagine Sisyphus happy। সিসিফাস পাথর গড়িয়ে নিয়ে যায় পাহাড়ে, পাথর গড়িয়ে পড়ে, সে আবার নিয়ে যায়। এটাই জীবন। কিন্তু সিসিফাস সুখী।”বকুল বলল, “এটা কি বাস্তব?”“তুই বাস্তব করবি।” আশিক হাত বাড়াল। “মিয়া, তুই ডাক্তার হবি।”“তুইও।”“দেখা যাক।”করমর্দন।আশিক নেমে গেল।বকুল ফাঁকা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রইল একটু।তারপর ঘরে গেল।মেডিকেলের বই খুলল।মেডিকেলে দুইবার।হয়নি।বকুল হিসাব করল। বাবাকে বলল।চায়না।Guangzhou Medical University।চীনের দক্ষিণে, গুয়াংজু শহরে। পার্ল রিভারের শহর। বাংলাদেশ থেকে অনেক ছাত্রছাত্রী পড়তে আসে এখানে।বাবা বললেন, “ব্যবস্থা হবে।”বকুল গেল।গুয়াংজু।বিমান থেকে নামল — শীতের শেষ, ফেব্রুয়ারি মাস। বাতাস ঠান্ডা, পরিষ্কার। বিমানবন্দরে চীনা হরফের সাইনবোর্ড, চীনা মানুষের ভিড়।বকুল একটু দাঁড়াল।তারপর হাঁটল।Yuexiu District-এ হোস্টেল। ছোট ঘর, দুটো বেড। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে চীনা বাড়িঘর, রাস্তায় সাইকেল আর স্কুটার।প্রথম তিন মাস অদ্ভুত।সবকিছু অচেনা — ভাষা, খাবার, মানুষের চলন। বাজারে গেলে কিছু বোঝা যায় না। রেস্তোরাঁয় মেনু চীনা হরফে।কিন্তু বকুল ভাঙেনি।সে শিখতে শুরু করল।চীনা ভাষার কিছু শব্দ — বাজারে কাজ চলে এমন। “নিহাও” মানে হ্যালো। “শিয়েশিয়ে” মানে ধন্যবাদ।ক্যাম্পাসে বন্ধু হলো।আলী — ইরানের ছেলে। চোখ তীক্ষ্ণ, কথা কম। পদার্থবিজ্ঞানের মতো মেডিকেল পড়ে — সবকিছুতে সূত্র খোঁজে। এমেকা — নাইজেরিয়ার ছেলে। বিশাল হাসি, বিশাল কণ্ঠ। বলত — “আমাদের গ্রামে বলে, একলা মানুষ অর্ধেক মানুষ।” লিন — চীনের মেয়ে। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের সাথে বন্ধু। বলত, “প্রতিটা ভাষা একটা আলাদা পৃথিবী।”এরা মিলে ফুটবল খেলত ক্যাম্পাসের মাঠে।বকুল মিডফিল্ডে।পাস দিত।একই ছিল।বিকেলে পার্ল রিভারের পাড়ে হাঁটত।এই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সে মাঝেমাঝে ছাগলনাইয়ার কথা ভাবত।ফেনীর সেই শাখা নদী আর এই নদী — হাজার মাইল দূরে। কিন্তু পানি একই।মানুষও একই।ছাগলনাইয়ায় মানুষ ভালোবাসতে চায়। গুয়াংজুতেও চায়।ভাষা আলাদা। চাওয়াটা একই।ছয় বছর।MBBS সম্পন্ন।BMDC। লাইসেন্স পরীক্ষা। ইন্টার্নশিপ।ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ।হাসপাতালের প্রথমদিন — সাদা অ্যাপ্রন পরে বকুল ওয়ার্ডে ঢুকল।সারি সারি বেড। রোগী শুয়ে আছে। স্বজনরা বসে আছে — মুখে চিন্তা, চোখে প্রশ্ন।একজন সিনিয়র ডাক্তার বললেন, “প্রথম রোগী দেখো।”বকুল গেল।একজন বৃদ্ধ মানুষ। বুকে ব্যথা।বকুল বসল। প্রশ্ন করল।রোগী কথা বলতে পারছে না ঠিকমতো — ভয়ে, কষ্টে।বকুল অপেক্ষা করল।শুনল।এই শোনাটাই সবচেয়ে কঠিন ছিল — শুধু কানে নয়, পুরো মনোযোগ দিয়ে।সে বুঝল — বই আর রোগী আলাদা।ইন্টার্নশিপের দুই বছরে রাত তিনটায় কল আসত। সে উঠত। যেত।ক্লান্তি ছিল।কিন্তু একটা তৃপ্তিও ছিল — একজন মানুষ কষ্টে এসেছিল, একটু কম কষ্টে ফিরে গেছে।এটুকুই।ইন্টার্নশিপ শেষে বেসরকারি হাসপাতালে যোগ দিল।মেডিসিন বিভাগ।ডা. বকুল হোসেন।বকুল বিয়ে করল।নওরিন।ডাক্তার। একই হাসপাতালে ছিল। শান্ত মানুষ, কথা কম, কিন্তু বোঝাপড়া গভীর।দুজনের মধ্যে অনেক কিছু না বলেও বোঝা যায়।এটাই তাদের ভাষা।রমজানের শেষ।ঈদুল ফিতর।বকুল ঢাকা থেকে রওনা দিল ছাগলনাইয়ায়।নওরিনকে নিয়ে।বাস। কুমিল্লা রোড। তারপর ফেনী। তারপর ছাগলনাইয়া।বাসস্ট্যান্ডে নামতেই সেই গন্ধ।মাটির গন্ধ। ভাজা খাবারের গন্ধ। কোথাও থেকে ফুলের গন্ধ।বকুল একটু দাঁড়াল।নওরিন পাশে।“এটাই তোমার গ্রাম?”“হ্যাঁ।”বাড়ি পৌঁছাল।মা রান্না করেছেন — সেমাই, পোলাও, মাংস, ইলিশ ভাজা।বাবা বারান্দায় বসে আছেন — পাঞ্জাবি পরা, মুখে শান্ত হাসি।পেয়ারা গাছটা আরো বড় হয়েছে। ডাল ছড়িয়েছে।দুপুরের পরে সেই গাছের নিচে বকুল বসল।ঈদের দিনে আকাশ পরিষ্কার। রোদ আছে কিন্তু গরম নয়। একটা মৃদু বাতাস আসছে — পাতা নড়ছে।বোনের বাচ্চারা উঠোনে খেলছে।তারপর পাড়ার একটা বাচ্চা ছুটে এলো।“বকুল ভাই, গেটে একজন আপু।”“কে?”“সুইটি আপু বলল।”বকুল উঠল।গেটের বাইরে সুইটি দাঁড়িয়ে।বকুল তাকে দেখল।সময় কী করে মানুষকে বদলায় — এই প্রশ্নের উত্তর সে এখন চোখের সামনে দেখছে।সুইটির চুলে সাদার ছোঁয়া আসছে। মুখে ক্লান্তির রেখা। চোখের নিচে কালি। শরীরে তিন সন্তানের ছাপ — ভারী, ক্লান্ত।পরনে হালকা নীল শাড়ি — ঈদের পোশাক, কিন্তু মুখের ক্লান্তি পোশাকের উজ্জ্বলতাকে ছাড়িয়ে গেছে।কিন্তু সেই চোখ।এখনো সেই চোখ।“ঈদ মোবারক।”“ঈদ মোবারক।”সুইটি বলল, “তুমি ডাক্তার হয়েছ।”“হ্যাঁ।”“চায়নায় পড়েছ?”“হ্যাঁ।”একটু চুপ।সুইটি বলল, “আমি ভাবিনি।”“কী ভাবোনি?”“যে তুমি এতদূর যাবে।” সুইটি একটু মাথা নোয়াল। “তখন মনে হয়েছিল — তুমি শান্ত, চুপচাপ। ভাবিনি এই চুপচাপ মানুষটা এত বড় কিছু করবে।”বকুল বলল, “চুপচাপ মানুষ চুপচাপ কাজ করে।”সুইটি একটু হাসল — ক্লান্ত হাসি।“তোমার বউ ডাক্তার?”“হ্যাঁ।”“ভালো।”একটু নীরবতা। রাস্তায় পাশ দিয়ে একটা রিকশা গেল।“বকুল, তুমি কি রাগ করোনি আমার জন্য?”“না।”“সত্যি?”“হ্যাঁ।” বকুল বলল, “রাগ করার কী ছিল? তুমি তোমার পথ বেছেছিলে। আমি আমার।”“আমার পথটা ঠিক ছিল না।”“এখন বুঝছ।”সুইটি বলল, “এখন বুঝে কী হবে?”বকুল একটু ভাবল।“আমার এক বন্ধু ছিল — আশিক। গাজীপুরের শ্রীপুরের ছেলে। সে বলত — দোস্তয়েভস্কি বলেছিলেন, কষ্ট মানুষকে মানুষ করে। কষ্ট ছাড়া গভীরতা নেই।”“তুমি দার্শনিক?”“না।” বকুল বলল, “আশিক দার্শনিক। আমি শুধু ডাক্তার।”সুইটি একটু হাসল।“তোমার শরীর কেমন?” বকুল জিজ্ঞেস করল।“ভালো না।” সুইটি বলল, “পিঠে ব্যথা। মাথাব্যথা। রক্তচাপ বেশি। ঘুম কম।”“কতদিন?”“দুই বছরের বেশি।”“ডাক্তার দেখাওনি?”“সময় পাই না। তিনটা বাচ্চা।”বকুল বলল, “সময় বের করতে হবে।”“সহজ কথা।”“সহজ কাজও।” বকুল বলল, “একটা চেকআপ করাও। রক্তচাপ, থাইরয়েড। এটুকু করলে বাকিটা বোঝা যাবে।”সুইটি মাথা নাড়ল।“বকুল, একটা কথা বলব?”“বলো।”“সেদিন গলির মুখে তুমি কোচিংয়ের কথা বলেছিলে।”“মনে আছে।”“তুমি না বললে আমি যেতাম না।”“হয়তো যেতে না। হয়তো অন্য কোথাও যেতে।”“তার মানে সব কিছুর শুরু তোমার থেকে।”বকুল একটু থামল।“না।” সে বলল, “আমি একটা পথের কথা বলেছিলাম। পথ দিয়ে কে যাবে, কোথায় যাবে — সেটা পথের দোষ নয়। পথচারীর পছন্দ।”সুইটি চুপ করে রইল।“তুমি ঠিকই বলেছ।”একটু চুপ।“যাই।”“ঈদ ভালো কাটুক।”“তোমারও।” সুইটি বলল, “বাচ্চারা ভালো আছে।”“কতজন?”“তিনটা। তিনটাই দুষ্টু।” সুইটির মুখে এবার সত্যিকারের হাসি — মায়ের হাসি।বকুলও হাসল।“ভালো।”সুইটি হাঁটতে লাগল।মোড়ে পৌঁছে একবার ঘুরল।বকুল দাঁড়িয়ে গেটে।চোখ মিলল।তারপর সুইটি মোড়ের ওপারে হারিয়ে গেল।উঠোনে ফিরে এলো বকুল।পেয়ারা গাছের নিচে বসল।বিকেলের রোদ পাতায় পাতায় খেলছে।নওরিন এলো।পাশে বসল।“কে ছিল?”“পুরনো পরিচিত।”নওরিন আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।বোনের মেয়ে পেয়ারা গাছে উঠতে চাইছে।প্রথমবার পড়ল।দ্বিতীয়বার পড়ল।তৃতীয়বার আরেকটু উঁচুতে উঠে গেল।চতুর্থবার — উঠে গেল।নিচ থেকে হাত নাড়ল।বকুল হাত নাড়ল।নওরিন বলল, “দেখছ কী?”বকুল বলল, “পড়লেই উঠতে পারে।”নওরিন তার দিকে তাকাল।বকুল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।পরেরদিন ভোরে।ফজরের আজান।বকুল উঠোনে।অক্টোবরের মতো নয় এখন — রমজানের শেষে এপ্রিলের গরম। কিন্তু ভোরটা ঠান্ডা এখনো। মাটিতে একটু শিশির।সে খালি পায়ে দাঁড়াল।মাটির স্পর্শ পেল।পুবে আলো আসছে।পাখি ডাকছে।বাবা এলেন।পাশে দাঁড়ালেন।কিছু বললেন না।দুজন চুপচাপ।তারপর বাবা বললেন, “থামিসনি।”বকুল বলল, “না।”“তাই পৌঁছেছিস।”একটু চুপ।“চা খাবি?”“হ্যাঁ, আব্বা।”দুজনে ভেতরে গেল।নওরিন মায়ের সাথে রান্নাঘরে। চায়ের কেটলি গরম হচ্ছে। মা হাসছেন কোনো কথায়।বকুল দরজায় দাঁড়াল।দেখল।এই দৃশ্যের দাম কত? কতটা রাত, কতটা একাকীত্ব, কতটা পড়া, কতটা ব্যর্থতার পর উঠে আসা — এই সব কিছুর বিনিময়ে এই একটা সকাল।সহজ পথে গেলে এই সকাল পাওয়া যেত না।সে ভেতরে গেল।চা নিল।বাবার পাশে বসল।সকাল হলো ছাগলনাইয়ায়। আরেকটি সুন্দর সকাল, তাকানোর মতো সকাল! সেদিনই আশিক ফোন করেছিল অন্য শহর থেকে।“মিয়া, কেমন আছিস?”“ভালো আছি। তুই?”“আছি। ডাক্তার হয়েছিস?”“হ্যাঁ।”“বলেছিলাম।” আশিক হাসল ফোনে। “আর সেই সুইটি?”“দেখা হয়েছে। ঈদে।”“কেমন?”“ঠিক নেই। তিন বাচ্চা। শরীর ভালো না।”“আহ।” আশিক একটু চুপ করে রইল। “রুমি বলতেন — ‘তুমি যা খোঁজো, সেটাই তোমাকে খোঁজে।’ সে উষ্ণতা খুঁজেছিল। উষ্ণতা পেয়েছিল — কিন্তু সেটা টেকেনি। কারণ যে উষ্ণতার শিকড় নেই, সেটা মৌসুমি ফুলের মতো।”বকুল বলল, “তুই দার্শনিক হয়ে গেছিস পুরোপুরি।”“না মিয়া। আমি এখনো পর্যবেক্ষক।” আশিক বলল, “আর তুই?”“আমি ডাক্তার।”“শুধু?”“শুধু।”“মিয়া।” আশিকের গলায় হাসি। “তুই জানিস না তুই কী, কিন্তু আমি জানি।”“কী?”“তুই সেই মানুষ যে অ্যারিস্টটলের eudaimonia বাঁচে — প্রতিদিন। ভোরে উঠোনে দাঁড়াও। মিডফিল্ডে পাস দাও। পড়ো। হারলে উঠো। নিটশের ভাষায় — was mich nicht umbringt — যা তোমাকে ধ্বংস করেনি, তা তোমাকে শক্ত করেছে। কামুর ভাষায় — তুই সিসিফাস, কিন্তু তুই সুখী।”বকুল একটু হাসল।“তুই পাগল।”“হ্যাঁ। কিন্তু ঠিক পাগল।”
প্রথম গল্প — যখন সকাল হবে (রোমান্টিক — একটি গল্পসংকলন )
যখন সকাল হবেছাগলনাইয়ার শান্ত, বর্ষা-ধোয়া মাঠে বেড়ে ওঠা বকুল হোসেন এক অদ্ভুত রোমান্টিক যুবক। সে বড় বড় কথা বলে না, কিন্তু তার ভেতরে গভীর অনুভূতি লুকিয়ে থাকে। আঠারো বছর বয়সে সে ফুটবল খেলে, ভোরবেলা খালি পায়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখে, আর চুপচাপ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তার কাছে ভালোবাসা মানে জোর করে কাউকে পাওয়া নয়, বরং নীরবে পাশে থাকা ও ছোট ছোট মুহূর্ত সংগ্রহ করা।এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় সে আরাফাত কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়। সেখানে একদিন পাড়ার মেয়ে সুইটি (সুমাইয়া)-কে দেখে। সুইটির গোলগাল মুখ, টোল পড়া হাসি আর গোলগাল হাতের লেখা বকুলের মনে গভীর দাগ কাটে। কয়েকবার সামান্য কথা হয়। বকুলের ভেতরে একটা নীরব আশা জন্ম নেয়। কিন্তু শীঘ্রই সে দেখতে পায়, সুইটি তাদের যুবক শিক্ষক জুয়েল স্যারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। জুয়েল স্যারের একাকীত্ব ও মনোযোগ সুইটির অভাব পূরণ করে।বকুল কোনো ঝগড়া বা নাটক করে না। সে নীরবে ব্যথা গিলে ফেলে। তার হৃদয়ের কষ্টকে পড়াশোনা ও ফুটবলের মাধ্যমে শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ঢাকায় গিয়ে সে আশিক হাসান নামের এক দার্শনিক ও আনন্দময় রুমমেটের সঙ্গে পরিচিত হয়। আশিকের সঙ্গে গভীর রাতের ছাদে বসে স্টোয়িক দর্শন, রুমি, নিটশে ও কামুর কথা শোনে। এসব কথা তাকে শেখায় — যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা ছেড়ে দিতে।এরপর শুরু হয় কঠিন সংগ্রাম। এইচএসসিতে ভালো ফল, মেডিকেলে না পাওয়া, চীনের গুয়াংজু মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে এমবিবিএস পড়া, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে লড়াই — সবকিছু পেরিয়ে বকুল অবশেষে ডাক্তার হয়ে দেশে ফেরে। সে নওরিন নামে এক শান্ত ডাক্তার মেয়েকে বিয়ে করে। তাদের সম্পর্ক কথায় কম, বোঝাপড়ায় গভীর।ঈদের ছুটিতে ছাগলনাইয়ায় এসে বকুল অনেক বছর পর সুইটির সঙ্গে দেখা করে। সময় সুইটিকে অনেক বদলে দিয়েছে। জুয়েল স্যারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, তিন সন্তানের মা হয়েছে। তার চোখে ক্লান্তি, শরীরে অসুস্থতা। সেই দেখায় বকুলের কোনো রাগ নেই, শুধু শান্ত স্বীকৃতি আছে। সুইটি তার পুরনো ভুল বুঝতে পারে, আর বকুল তাকে সামান্য চিকিৎসা পরামর্শ দেয়।যখন সকাল হবে একটি নীরব, গভীর রোমান্টিক গল্প। এতে দেখানো হয়েছে — সত্যিকারের রোমান্টিসিজম মানে চিৎকার করে ভালোবাসা নয়, বরং নিজেকে শক্ত করে গড়ে তোলা, কষ্ট মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং প্রতিদিন সকালের মতো নতুন করে শুরু করা। বকুলের জীবন আমাদের শেখায় যে, যারা সকালের আলোয় চুপ করে দাঁড়াতে পারে, তারাই সবচেয়ে বড় রোমান্টিক।গল্পটি ছাগলনাইয়ার প্রকৃতি, ঋতু ও মানুষের সাধারণ জীবনের সুন্দর বর্ণনায় ভরপুর, যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে।
0 Comments