সন্ধ্যার শেষ আলো তখন ধীরে ধীরে গাছের মাথা ছুঁয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার মোড়ের ছোট্ট চায়ের দোকানে বসে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ে শেষ চুমুক দিচ্ছিলাম। দোকানের চারপাশে মানুষের কোলাহল, চায়ের কাপে চামচের টুংটাং শব্দ—সবই ছিল স্বাভাবিক।
হঠাৎ একজন অপরিচিত লোক এসে শান্ত গলায় বলল, — \"একটু এদিকে আসবেন? আপনার সঙ্গে জরুরি কিছু কথা আছে।\"
লোকটির চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা ছিল। তাকে দেখে খারাপ মানুষ মনে হলো না। চা শেষ করে তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম।
কিছু দূরে, জনমানবহীন এক নিরিবিলি জায়গায় পৌঁছাতেই আচমকা পেছন থেকে দুজন লোক আমাকে শক্ত করে চেপে ধরল।
— \"এ কী করছেন? আমাকে ছাড়ুন!\"
তারা একসঙ্গে এমনভাবে হেসে উঠল, যেন বহুদিনের অপেক্ষার শিকার পেয়ে গেছে। আমি প্রাণপণে চিৎকার করলাম। আশপাশে মানুষ ছিল, কিন্তু আশ্চর্য! কেউ যেন আমাকে শুনতেই পেল না। মনে হচ্ছিল, আমার কণ্ঠস্বর বাতাসেই হারিয়ে যাচ্ছে।
তারা আমাকে টেনে নিয়ে গেল ঝোপে ঢাকা এক পরিত্যক্ত স্থানে। সেখানে ছিল একটি বিশাল অন্ধকার গর্ত।
এক ধাক্কায় আমাকে ফেলে দিল নিচে।
আমি পড়তেই থাকলাম... পড়তেই থাকলাম...
মনে হচ্ছিল, সময় থেমে গেছে।
হঠাৎ পড়া থেমে গেল।
চোখ খুলে দেখি, নিচে এক অদ্ভুত নগরী। চারদিকে পাথরের বাড়ি, প্রশস্ত রাস্তা, ঝরনার মতো আলো, ফুলে ভরা বাগান। সবকিছু সুন্দর, পরিপাটি, শৃঙ্খলাবদ্ধ।
কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মধ্যে ছিল এক ভয়ংকর নীরবতা।
হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে, হাঁটছে, বসে আছে—কিন্তু কারও মুখে একটি শব্দও নেই।
আরও বিস্ময়কর বিষয়, তাদের অনেককেই আমি চিনতে পারলাম। তারা সবাই বহু বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।
আমি কাঁপা গলায় একজন পরিচিত মানুষকে ডাকলাম।
সে ধীরে ধীরে আমার দিকে ফিরল। তার চোখে ছিল সীমাহীন ক্লান্তি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, — \"এটা কোথায়? তোমরা এমন নীরব কেন?\"
সে ঠোঁট নাড়ল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। কিছুক্ষণ পরে যেন অদৃশ্য কোনো অনুমতি পেয়ে ফিসফিস করে বলল,
— \"এখানে কথা বলার অধিকার নেই। আমরা সবাই নিজের নীরবতার বন্দি।\"
আমি বিস্ময়ে আরও জানতে চাইলাম।
সে বলল,
— \"যারা নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দেয়, তাদের জন্য এই নগরী। এখানে সময় চলে না, রাত-দিনের পার্থক্য নেই। শরীরের প্রতিটি শিরায় আগুনের মতো জ্বালা। যেন অসংখ্য গুঁড়ো মরিচ রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। এক মুহূর্তেরও শান্তি নেই।\"
আমি চারদিকে তাকালাম।
দেখলাম, মানুষের মুখে কোনো কান্না নেই, কিন্তু চোখের গভীরে জমে আছে অনন্ত অনুশোচনা।
এক বৃদ্ধ আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুধু একবার তাকালেন। তাঁর চোখ যেন বলছিল,
\"এক মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্ত, আর অনন্ত অপেক্ষা...\"
ঠিক তখনই আকাশের মতো কালো ছাদের ওপর ভেসে উঠল অদ্ভুত এক ছায়ামূর্তি।
সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— \"এখানে যারা আসে, তারা ফিরে যায় না... কিন্তু তুমি ভুল করে চলে এসেছ। ফিরে গিয়ে মানুষকে বলো—জীবনের কষ্ট যত গভীরই হোক, তার শেষ পথ কখনো নিজের হাতে লেখা উচিত নয়।\"
হঠাৎ পুরো নগরী কেঁপে উঠল।
চারদিক থেকে অদ্ভুত শব্দ ভেসে এলো।
আমি দৌড়াতে শুরু করলাম।
দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে।
চোখ খুলে দেখি, আমি সেই চায়ের দোকানের বেঞ্চেই শুয়ে আছি।
দোকানদার বলল,
— \"ভাই, কী ভয়ংকর স্বপ্ন দেখছিলেন? বারবার চিৎকার করছিলেন!\"
আমি কিছু বললাম না।
শুধু দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে হলো—কিছু স্বপ্ন গল্প হয়ে যায়, আর কিছু গল্প মানুষকে বেঁচে থাকার মূল্য মনে করিয়ে দেয়।
সন্ধ্যার শেষ আলো তখন ধীরে ধীরে গাছের মাথা ছুঁয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার মোড়ের ছোট্ট চায়ের দোকানে বসে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ে শেষ চুমুক দিচ্ছিলাম। দোকানের চারপাশে মানুষের কোলাহল, চায়ের কাপে চামচের টুংটাং শব্দ—সবই ছিল স্বাভাবিক।
হঠাৎ একজন অপরিচিত লোক এসে শান্ত গলায় বলল, — \"একটু এদিকে আসবেন? আপনার সঙ্গে জরুরি কিছু কথা আছে।\"
লোকটির চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা ছিল। তাকে দেখে খারাপ মানুষ মনে হলো না। চা শেষ করে তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম।
কিছু দূরে, জনমানবহীন এক নিরিবিলি জায়গায় পৌঁছাতেই আচমকা পেছন থ
0 Comments