#গল্প দজ্জাল শ্বাশুড়ি আফছানা খানম অথৈআবীর এম.এ. পাস করেছে বেশ কিছুদিন হলো। কিন্তু চাকরি যেন তার ভাগ্যেই নেই। সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছে, লিখিত পরীক্ষা দিয়েছে, ভাইভাও দিয়েছে; তবু কোনো ফল মেলেনি। চারদিকে একটাই কথা—চাকরি পেতে হলে ঘুষ, তদবির আর প্রভাবশালী লোকের সুপারিশ লাগে। এসবের কোনোটাই আবীরের নেই।সংসারের অবস্থাও ভালো নয়। বৃদ্ধ বাবা কুদ্দুস আলী সামান্য আয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালান। তাই নিজের পড়াশোনার খরচ এবং সংসারে কিছুটা সাহায্য করার জন্য আবীর কয়েকটি টিউশনি করায়। স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রতিটি দিন তার কাছে এক কঠিন সংগ্রাম।এক বিকেলে কুদ্দুস আলী উঠোনে বসে পুরোনো হিসাবপত্র দেখছিলেন। এমন এমন সময় গ্রামের বিখ্যাত ঘটক হুজুত আলী হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল,—ভাইজান, সেই কখন থেকে আপনাকে খুঁজছি!কুদ্দুস আলী অবাক হয়ে বললেন,—কী ব্যাপার হুজুত আলী?—আপনার ছেলের জন্য একটা খুব ভালো সম্বন্ধ নিয়ে এসেছি।—কার মেয়ে?—মিয়া বাড়ির নজরুল মাস্টারের একমাত্র মেয়ে। বি.এ. পাস, শিক্ষিতা, ভদ্র আর দেখতে খুবই সুন্দর।কুদ্দুস আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,—ওরা বড়লোক মানুষ। আমাদের মতো গরিবের সঙ্গে সম্পর্ক করবে? আর আমার ছেলে তো এখনো বেকার। বিয়ে দিয়ে বউকে খাওয়াব কী?হুজুত আলী আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল,—এসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। নজরুল মাস্টার বলেছেন, আবীরের চাকরি থেকে শুরু করে বিয়ের সব খরচ তিনিই দেখবেন।কুদ্দুস আলীর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।—না হুজুত আলী, আমি যৌতুকের টাকায় ছেলের বিয়ে দেব না।—আরে ভাইজান, এটা যৌতুক নয়। মেয়ের বাবা খুশি হয়ে দিচ্ছেন। আপনি তো কিছু চাইছেন না।—তবু আমার বিবেকে বাধে। ছেলে বিক্রি করে সুখী হতে চাই না।ঘটক একটু নরম গলায় বলল,—নজরুল মাস্টারের খুব ইচ্ছা, আবীর তার জামাই হোক। এমন সুযোগ বারবার আসে না। একবার অন্তত ভেবে দেখুন।কুদ্দুস আলী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,—আচ্ছা, বাড়িতে সবার সঙ্গে কথা বলে জানাব।—তবে দেরি করবেন না ভাইজান। মেয়ের জন্য অনেক প্রস্তাব এসেছে।ঘটক চলে গেলে কুদ্দুস আলী স্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করলেন।সব শুনে আবীরের মা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,—আপনি বুঝতেছেন না। এত বড়লোক হঠাৎ আমাদের মতো গরিবের ঘরে মেয়ে দিতে চাইছে কেন? নিশ্চয়ই কোনো হিসাব আছে। আজ যা দেবে, কাল তার দশগুণ উসুল করবে। বড়লোকের বাড়ির মেয়ে আমাদের সংসারে মানিয়ে নিতে পারবে না।কুদ্দুস আলী স্ত্রীর কথায় সায় দিলেন।—আমিও তাই ভাবছি। আগে আবীরের একটা চাকরি হোক, তারপর বিয়ের কথা ভাবব।দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন—এ মুহূর্তে বিয়ে নয়।কিন্তু ঘটক হুজুত আলী এত সহজে হাল ছাড়ার মানুষ নয়।পরদিন বিকেলে কুদ্দুস আলী গ্রামের বাজারের চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন। এমন সময় ঘটক হুজুত আলীকে সঙ্গে নিয়ে নজরুল মাস্টার সেখানে উপস্থিত হলেন।দূর থেকেই হাসিমুখে সালাম দিয়ে তিনি কুদ্দুস আলীকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।—আসসালামু আলাইকুম, ভাইজান। অনেক দিন ধরেই আপনার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা ছিল।কুদ্দুস আলী কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও সৌজন্য বজায় রেখে উত্তর দিলেন। নজরুল মাস্টার দোকানে উপস্থিত সবার জন্য চায়ের অর্ডার দিলেন। পরিবেশটা মুহূর্তেই আন্তরিক হয়ে উঠল।চা হাতে নিয়ে তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,—ভাইজান, আজ থেকে আপনি শুধু প্রতিবেশী নন, আমার ভাই। আবীরকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি। ও ভদ্র, সৎ আর মেধাবী ছেলে। আমার একমাত্র মেয়ের জন্য ওর চেয়ে ভালো ছেলে আমি খুঁজে পাইনি।কুদ্দুস আলী মৃদু হেসে বললেন,—কথাগুলো শুনতে ভালো লাগছে। কিন্তু বিয়ের পরও কি এই আন্তরিকতা থাকবে?নজরুল মাস্টার দৃঢ়ভাবে বললেন,—আমি একজন শিক্ষক। মানুষের বিশ্বাস ভেঙে বাঁচতে শিখিনি। আবীরের চাকরি, প্রতিষ্ঠা—সবকিছুর দায়িত্ব আমি নেব। শুধু আপনি সম্পর্কটা মেনে নিন।দোকানে বসে থাকা কয়েকজন প্রবীণও বলতে শুরু করলেন,—কুদ্দুস আলী, এত ভালো সম্বন্ধ হাতছাড়া করো না। এমন মানুষ সবাই হয় না। আল্লাহ যখন দরজা খুলে দেন, তখন সেটা বন্ধ করতে নেই।চারদিক থেকে একই কথা শুনে কুদ্দুস আলীর মন নরম হয়ে গেল। দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি বললেন,—যদি আল্লাহর ইচ্ছা হয়, তাহলে আমার আপত্তি নেই।কথাটা শুনেই নজরুল মাস্টারের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি যেন আগেই সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। সেদিনই আত্মীয়স্বজনকে খবর পাঠানো হলো। জুমার নামাজের পর গ্রামের মসজিদে খুবই সাদামাটা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আবীর ও তারিনের বিয়ে সম্পন্ন হলো।বিয়ের পর জামাইকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন নজরুল মাস্টার। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী—সবাই তার আতিথেয়তার প্রশংসায় মুগ্ধ।এদিকে আবীরের বাড়িতেও আনন্দের আবহ। কিছুক্ষণের মধ্যেই চার কেজি মিষ্টি বেয়াইবাড়িতে পৌঁছে গেল। প্রতিবেশীরা এসে অভিনন্দন জানাতে লাগলেন।কেউ বলল,—আবীরের মা, তোমার তো ভাগ্য খুলে গেছে। এমন ঘরে ছেলের বিয়ে সবাই দিতে পারে না।আবীরের মা হেসে উত্তর দিলেন,—আল্লাহ ভালো রাখলে সবই ভালো হবে।তবে বুকের গভীরে অজানা এক আশঙ্কা বারবার উঁকি দিচ্ছিল। কেন জানি তিনি স্বামীর দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বললেন,—মানুষকে চেনা বড় কঠিন। আল্লাহ যেন আমাদের মুখে হাসি রাখেন।কুদ্দুস আলী স্ত্রীর কথায় কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু মনে মনে ভাবলেন, হয়তো এতদিনের কষ্টের পর এবার সুখের দিন সত্যিই এসেছে।বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই আবীরের জীবনে এলো সুখবর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে যে লিখিত পরীক্ষা সে দিয়েছিল, তার ফল প্রকাশিত হয়েছে। আবীর কৃতিত্বের সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।খবরটি শুনে নজরুল মাস্টারের আনন্দ যেন ধরে না। তিনি আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী—সবার মাঝে মিষ্টি বিতরণ করলেন। এরপর নিজের পরিচিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই আবীরের হাতে সরকারি নিয়োগপত্র এসে পৌঁছাল।বেকার জীবনের অবসান ঘটল। এখন সে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।আবীরের বাবা-মা আনন্দে আত্মহারা। কুদ্দুস আলী সিজদায় লুটিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। আবীরও মনে মনে ভাবল, এতদিনের কষ্টের অবসান হলো।কিন্তু সুখের দিন যত বাড়তে লাগল, ততই অদৃশ্যভাবে বদলাতে লাগল তার জীবন।শ্বশুরবাড়ি আর নিজের বাড়ি একই এলাকায় হলেও আবীরের বেশির ভাগ সময় কাটতে লাগল শ্বশুরবাড়িতে। নজরুল মাস্টার ও তার স্ত্রী জামাইকে অত্যন্ত আদর-আপ্যায়ন করতেন। আবীরও ধীরে ধীরে সেই পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে পড়ল।নিজের বাড়িতে সে এখন শুধু মাঝেমধ্যে এসে বাবা-মায়ের খোঁজ নিয়ে আবার ফিরে যায়।একদিন আবীরের মা ছেলেকে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,—বাবা, বউমাকে একদিন আমাদের বাড়ি নিয়ে আয় না। সবাই মিলে একটু গল্প করব।আবীর হাসিমুখে বলল,—আচ্ছা মা, খুব শিগগিরই নিয়ে আসব।সেদিনই সে কথাটা শাশুড়ির কাছে বলল।কিন্তু কথাটি শুনেই মহিলার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।—কী বললে? আমার মেয়ে তোমাদের বাড়িতে যাবে?আবীর অবাক হয়ে বলল,—কেন মা? ও তো আমাদের বাড়িরও বউ।শাশুড়ি ঠান্ডা গলায় বললেন,—তোমাদের সেই ভাঙাচোরা, অগোছালো পরিবেশে আমার মেয়ে থাকবে না।—না থাকুক, কিন্তু মা-বাবার সঙ্গে দেখা তো করতে পারে।—না, পারবে না।আবীর এবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল,—আমি ওর স্বামী। অন্তত একদিন আমার বাবা-মায়ের কাছে যাওয়া উচিত।কথাটা শেষ হতেই শাশুড়ি রাগে গর্জে উঠলেন।—স্বামী হলেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পাওনি। আজ থেকে আমার মেয়ে তোমাদের বাড়িতে যাবে না। যদি সুখে থাকতে চাও, তাহলে ওকে নিয়ে আলাদা বাসা ভাড়া করো।আবীর হতভম্ব হয়ে গেল।—আলাদা বাসা? আমার বেতনে সংসার চালাতেই কষ্ট হবে।শাশুড়ি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,—তোমার চাকরিটা কীভাবে হয়েছে ভুলে গেছ? আমরা চেষ্টা না করলে আজও তুমি বেকার থাকতে। এখন তোমার আয়ের টাকা শুধু আমার মেয়ে আর তার ভবিষ্যতের জন্য খরচ হবে। অন্য কারও জন্য নয়।কথাগুলো বলে তিনি ঘরের ভেতরে চলে গেলেন।আবীর অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ঠিক তখনই তারিন এসে মৃদু হেসে বলল,—চলো, খেতে চলো।আবীর মাথা নাড়ল।—আমার খিদে নেই।—কেন?—তুমি যদি আমার মা-বাবার বাড়িতে না যাও, তাহলে এই বাড়িতে আমারও খেতে ইচ্ছে করছে না।তারিন কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরে বলল,—তুমি ভুল বুঝছ। আম্মু আমাদের ভবিষ্যতের কথাই ভাবছে।—ভবিষ্যৎ?তারিন লাজুক হেসে আবীরের দিকে তাকাল।—হ্যাঁ... আমাদের ভবিষ্যৎ। আমি মা হতে চলেছি।খবরটা শুনে মুহূর্তেই আবীরের সমস্ত অভিমান গলে গেল। বাবা হওয়ার আনন্দে সে স্ত্রীর হাত শক্ত করে ধরল।সেই আনন্দের আড়ালেই সে বুঝতে পারল না—নিজের বাবা-মায়ের কাছ থেকে সে ধীরে ধীরে কত দূরে সরে যাচ্ছে।সন্তান আসার খবর আবীরের জীবনকে আনন্দে ভরিয়ে দিল। সেই আনন্দে কখন যে সে নিজের বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে গেল, তা সে নিজেও টের পেল না।শাশুড়ির ইচ্ছাতেই আবীর ও তারিন শহরে একটি ভাড়া বাসায় উঠল। বাসার প্রতিটি আসবাব, খাট, আলমারি, সোফা—সবই নজরুল মাস্টারের দেওয়া। নতুন সংসার, নতুন চাকরি আর অনাগত সন্তানের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আবীর ভাবতেই পারল না, তার বৃদ্ধ বাবা-মা দিন দিন কতটা অসহায় হয়ে পড়ছেন।আগের মতো আর নিয়মিত বাড়ি যাওয়া হয় না। মাসের পর মাস কেটে যায়। কখনো সময়ের অজুহাত, কখনো সংসারের ব্যস্ততা—এসবের আড়ালে জন্মদাতাদের প্রতি দায়িত্ব যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়।একদিন অনেক দিন পর আবীর গ্রামের বাড়িতে গেল।ঘরে ঢুকেই সে থমকে দাঁড়াল।মা শুকিয়ে কঙ্কালসার হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন। মুখে জ্বরের ছাপ, চোখদুটো গভীরে ঢুকে গেছে।ছেলেকে দেখেই তিনি কাঁপা কণ্ঠে ডাকলেন,—আবীর... বাবা... তুই এসেছিস?আবীর ছুটে গিয়ে মায়ের পাশে বসল।মা কাঁপা হাতে ছেলের মুখ ছুঁয়ে বললেন,—আরেকটু কাছে আয় বাপ। অনেক দিন তোকে দেখি না। ভালো করে একটু দেখি।আবীর মায়ের হাত নিজের হাতে নিয়ে চুপ করে বসে রইল।মা চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন,—কত কষ্ট কইরা তোকে মানুষ করলাম। এখন তুই আর আগের মতো আসিস না। আমরা কি তোর কেউ না রে বাবা?আবীর মাথা নিচু করে বলল,—এমন কথা বলো না মা। স্কুলের অনেক কাজ। তাই সময় পাই না।মা মৃদু হেসে বললেন,—সময় না পাইলে না পাইছস। কিন্তু টাকাও তো পাঠাস না। তোর বাপের আর আগের মতো শক্তি নাই। আমার অসুখও বাড়ছে। ডাক্তার দেখানোর টাকাও জোগাড় করতে পারতেছি না।মায়ের কথাগুলো যেন ছুরির মতো গিয়ে বিঁধল আবীরের বুকে।সে মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল,—মা, তুমি কেঁদো না। এই মাসের বেতন পেলেই তোমাকে শহরে নিয়ে বড় ডাক্তার দেখাব। যত টাকা লাগুক, আমি চিকিৎসা করাব।মায়ের চোখে তখন আবার আশার আলো জ্বলে উঠল।—আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক বাবা। এই কথাটাই শুনতে চাইছিলাম।কুদ্দুস আলী চুপচাপ সবকথা শুনছিলেন। তাঁরও চোখ ভিজে উঠেছিল। তবু তিনি কিছু বললেন না।সন্ধ্যার আগে আবীর আবার শহরে ফিরে গেল।তার যাওয়ার পর কুদ্দুস আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,—বউ, জানি না আবীর তার কথা রাখতে পারব কিনা।মা মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,—আমার ছেলে কথা দিছে। ও অবশ্যই আসব।কিন্তু মানুষ যা ভাবে, ভাগ্য সব সময় তা হতে দেয় না।ওদিকে আবীরের শাশুড়ির উচ্চ রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে গেল। তাকে দ্রুত শহরের একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হলো। একের পর এক পরীক্ষা, দামি ওষুধ আর চিকিৎসার খরচে আবীরের মাসের অর্ধেক বেতন শেষ হয়ে গেল।বাড়ি ফিরে আবীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাতে যে সামান্য টাকা বাকি আছে, সেটাই মায়ের চিকিৎসার জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল।ঠিক তখনই শাশুড়ি বললেন,—আবীর, হাতে কত টাকা আছে?—কিছু টাকা আছে মা। ভাবছি, গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেব। আম্মার শরীর খুব খারাপ। বড় ডাক্তার দেখাতে হবে।কথাটা শেষ হতেই শাশুড়ির মুখ শক্ত হয়ে গেল।—কী বললে? সামনে তারিনের সন্তান হওয়ার সময়। হাসপাতালে ভর্তি, ওষুধ, কত খরচ হবে জানো? এখন যদি সব টাকা তোমার মায়ের পেছনে খরচ করো, তখন কী করবে?আবীর শান্ত গলায় বলল,—কিন্তু আমি মাকে কথা দিয়েছি।—বৃদ্ধ মানুষের অসুখ কি আর ভালো হয়? ওসব রোগের পেছনে টাকা ঢেলে লাভ নেই। বরং সেই টাকা নিজের সংসারের জন্য জমাও।কথাগুলো বলে তিনি আবীরের হাত থেকে টাকাগুলো নিয়ে তারিনের হাতে দিয়ে বললেন,—এগুলো আলমারিতে রেখে দাও। সামনে অনেক দরকার হবে।আবীর নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো, নিজের কষ্টার্জিত টাকার ওপরও যেন তার কোনো অধিকার নেই।তারিনও মায়ের কথার বিরোধিতা করল না। বরং নিচু স্বরে বলল,—আম্মু যা বলছে, আমাদের ভালোর জন্যই বলছে।আবীর আর কোনো কথা বলল না। শুধু মায়ের অসহায় মুখটা বারবার তার তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল।অন্যদিকে গ্রামের বাড়িতে দিন দিন আবীরের মায়ের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগল। দীর্ঘদিনের জ্বর অবহেলায় ভয়ংকর টাইফয়েডে রূপ নিল। কিন্তু দরিদ্র কুদ্দুস আলীর পক্ষে শহরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব হলো না।তিনি গ্রামের এক পল্লি চিকিৎসকের কাছ থেকে জ্বরের ওষুধ এনে স্ত্রীকে খাওয়াতে লাগলেন।প্রতিদিন স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন,—আরেকটু ধৈর্য ধরো বউ। আবীর বলেছে বেতন পেলে ডাক্তার দেখাবে। নিশ্চয়ই আসবে।কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যা নামে, রাত পেরিয়ে সকাল হয়—তবু আবীর আর আসে না।এদিকে সময়ও আর অপেক্ষা করছিল না।এক রাতে হঠাৎ তারিনের প্রসববেদনা শুরু হলো। তড়িঘড়ি করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো।একই সময়ে গ্রামের ছোট্ট ঘরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন আবীরের মা।একদিকে নতুন প্রাণের অপেক্ষা, অন্যদিকে নিভে যেতে থাকা এক মায়ের জীবন।ভাগ্য যেন একই দিনে দুটি পরিবারের জন্য দুটি নির্মম সিদ্ধান্ত লিখে রেখেছিল...।গভীর রাতে তারিনকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটল আবীর। প্রসববেদনায় সে বারবার কাতরাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দায়িত্বরত চিকিৎসক দ্রুত বাইরে এসে বললেন,—রোগীর অবস্থা খুবই জটিল। আর দেরি করা যাবে না। এখনই সিজার করতে হবে। তবে একটি বিষয় মনে রাখবেন, মা ও সন্তানের দুজনকেই সুস্থ রাখা কঠিন হতে পারে।কথাগুলো শুনে আবীরের বুক কেঁপে উঠল। সে অসহায় চোখে শাশুড়ির দিকে তাকাল।শাশুড়ি এক মুহূর্ত দেরি না করে বললেন,—ডাক্তার, আমার মেয়েকে বাঁচান। যা করার দ্রুত করুন।কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে আবীর অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অপেক্ষা করতে লাগল। প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটি যুগের সমান দীর্ঘ।অবশেষে প্রায় এক ঘণ্টা পর চিকিৎসক বেরিয়ে এলেন।তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,—মাকে আমরা বাঁচাতে পেরেছি। কিন্তু খুব দুঃখিত...,। শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।কথাটা শুনে আবীরের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। বাবা হওয়ার যে স্বপ্ন সে এতদিন বুকের মধ্যে লালন করেছিল, মুহূর্তেই তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।হাসপাতালের এক কোণে দাঁড়িয়ে সে নির্বাক হয়ে রইল। চোখ থেকে শুধু অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।ঠিক সেই সময় গ্রামের বাড়িতে মৃত্যুর সঙ্গে শেষ লড়াই করছিলেন তার মা।জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে তিনি দুর্বল কণ্ঠে স্বামীকে বললেন,—ওগো... আবীর আসল না? ও তো বলেছিল, আমারে বড় ডাক্তার দেখাবে। আমার ছেলেটারে একবার দেখতে খুব ইচ্ছা করছে...কুদ্দুস আলী আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। চোখের পানি মুছতে মুছতে স্ত্রীর হাত শক্ত করে ধরে বললেন,—কেঁদো না বউ। আবীর নিশ্চয়ই আসবে। হয়তো কোনোকাজে আটকা পড়ছে।মা দুর্বল হাসলেন।—আসলে বলবা... আমি রাগ করি নাই... শুধু একবার দেখতে চাইছিলাম...।এই ছিল তাঁর শেষ কথা।কিছুক্ষণ পর নিঃশব্দেচিরদিনের জন্য চোখ বুজলেন তিনি।ঘরভর্তি মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়ল। কুদ্দুস আলী স্ত্রীর নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে বসে রইলেন।ছেলেকে খবর দেওয়ার জন্য অনেকেই বলল। কিন্তু বুকভরা অভিমান নিয়ে তিনি ধীর কণ্ঠে বললেন,—না... খবর দেয়ার দরকার নাই। যে মায়ের জীবিত মুখ দেখতে পারল না, সে মৃত মুখ দেখে আর কী করব?সেদিনই হাসপাতাল থেকে মৃত নবজাতককে নিয়ে গ্রামের পথে রওনা হলো আবীর।সে তখনও জানত না—যে বাড়িতে সে ফিরছে, সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে জীবনের সবচেয়ে বড় শোক।একই দিনে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে তার সন্তান... আর তার জন্মদাত্রী মা।হাসপাতাল থেকে মৃত নবজাতককে নিয়ে গ্রামে ফিরল আবীর। সারা পথ সে নিথর হয়ে বসে ছিল। বুকের ভেতর এক অজানা শূন্যতা।গ্রামের কাছাকাছি আসতেই সে দেখল, তাদের বাড়ির সামনে অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়েছে। চারদিকে কান্নার শব্দ।আবীরের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।সে দৌড়ে উঠোনে ঢুকতেই দেখল, সাদা কাফনে মোড়ানো একটি লাশ খাটিয়ায় শুয়ে আছে। চারপাশে ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েছে।এক মুহূর্তেই সব বুঝে গেল সে।চিৎকার করে খাটিয়ার পাশে লুটিয়ে পড়ল।—মা...! মা, একবার চোখ খোলো। আমি এসেছি মা... তোমারে বড় ডাক্তার দেখাতে পারলাম না। তোমার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। আমাকে মাফ করে দাও মা... আমি বড় অপরাধী...।সে বারবার মায়ের নিথর হাত নিজের কপালে ছুঁইয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগল। উপস্থিত মানুষের চোখও অশ্রুসজল হয়ে উঠল।কুদ্দুস আলী ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।ভাঙা কণ্ঠে বললেন,—কাঁদিস না আবীর। এখন কেঁদে আর লাভ কী? তোর মা শেষ সময় পর্যন্ত শুধু তোর অপেক্ষায় ছিল। বারবার বলেছিল, “আমার ছেলেটারে একবার দেখতে চাই।”কথাগুলো শুনে আবীরের বুকটা যেন ছিঁড়ে গেল।কুদ্দুস আলী আবার বললেন,—একটা কথা সারাজীবন মনে রাখিস বাবা, মা-বাবার দোয়া মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর তাদের চোখের পানি মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। যারা জন্মদাতাকে কষ্ট দেয়, তারা কখনো সত্যিকারের সুখ পায় না।আবীর আর কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু মায়ের পায়ের কাছে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।কিছুক্ষণ পর জানাজা অনুষ্ঠিত হলো।সেদিনের দৃশ্যটি ছিল গ্রামের মানুষের কাছে এক হৃদয়বিদারক স্মৃতি।একদিকে দাদির জানাজা, অন্যদিকে সদ্য জন্ম নেওয়া মৃত নাতির দাফন।একই কবরস্থানে, অল্প দূরত্বে, পাশাপাশি মাটির বুকে শুয়ে গেল দুই প্রজন্ম।দাফন শেষে সবাই একে একে বাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু আবীর অনেকক্ষণ মায়ের কবরের পাশে বসে রইল। বুকভরা অনুতাপ নিয়ে সে শুধু কাঁদছিল।কুদ্দুস আলী ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন,—বাবা, মানুষ ভুল করে। কিন্তু কিছু ভুলের ক্ষমা হয় না। মা-বাবার হক আদায় করতে না পারলে সেই কষ্ট সারাজীবন বুকের ভেতর জ্বলতে থাকে।আবীর মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মায়ের শেষ আকুতি— \"বাবা, আমাকে বড় ডাক্তার দেখাস...\" কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর রাখা হলো না।দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল তারিন। তার চোখও অশ্রুসিক্ত। আর তার মা—যিনি একদিন নিজের স্বার্থের জন্য জামাইকে জন্মদাতা মা-বাবা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন—নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু সেই নীরবতা কোনো অনুতাপের ভাষা বলতে পারল না।স্বার্থ, অহংকার আর কর্তৃত্বের নেশায় তিনি বুঝতেই পারেননি, একটি সংসার ভেঙে দেওয়া কত বড় অপরাধ। তাঁর একের পর এক সিদ্ধান্ত শুধু একজন মায়ের জীবনই কেড়ে নেয়নি, একজন ছেলেকেও সারাজীবনের অনুশোচনার আগুনে পুড়তে বাধ্য করেছে।এমন মানুষ শাশুড়ি নামের মর্যাদা বহন করলেও, প্রকৃত অর্থে তাঁরা শাশুড়ি নন; তাঁরা স্বার্থের কাছে মানবিকতাকে বিসর্জন দেওয়া মানুষ। আর এই কারণেই সমাজে তাঁদের মতো মানুষকে অনেকেই \"দজ্জাল শ্বাশুড়ি\" বলে আখ্যায়িত করে। —সমাপ্ত—
0 Comments