সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাটা একটু বেশিই জমে গিয়েছিল। কখন যে রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে, খেয়ালই করিনি।
বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করলাম। চারপাশ তখন নিস্তব্ধ। দূরে দু-একটা কুকুরের ডাক, মাথার ওপর মেঘে ঢাকা চাঁদ—সব মিলিয়ে রাতটা কেমন অস্বাভাবিক লাগছিল।
আমাদের বাড়ি যেতে হলে কিছুদূর পাকা রাস্তা ধরে গিয়ে বিশাল একটা মাঠ পার হতে হয়।
মাঠের মাঝামাঝি যেতেই হঠাৎ চোখে পড়ল—মাঠের এক পাশে বেশ কয়েকটি কুঁড়েঘর! আর মনে হল সেখানে বিয়ের আয়োজন চলছে।আমি থমকে দাঁড়ালাম।এখানে তো কোনো ঘরবাড়ি নেই!
ভাবলাম, হয়তো কোনো বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন এসে অস্থায়ীভাবে বসতি গড়েছে। কৌতূহল হলো। জীবনে বেদেদের অনেক গল্প শুনেছি, কিন্তু তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান কখনো দেখিনি।
তাই একটু কাছে গিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম।
দুই সারি কুঁড়েঘরের মাঝখানে ঢুকতেই আমার বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
চারপাশ সুন্দর করে সাজানো। কোথাও প্রদীপ জ্বলছে, কোথাও রঙিন কাপড় ঝুলছে। অদ্ভুত এক ধরনের বাদ্যযন্ত্রের শব্দ ভেসে আসছে।
আর মাঝখানে একটি কাঠের মঞ্চের মতো জায়গায় বসানো হয়েছে এক তরুণীকে।
আমি তাকিয়ে রইলাম।
এমন সুন্দরী মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।
লম্বা কালো চুল, মুখে অদ্ভুত মায়া, চোখ দুটো যেন আলো ছড়াচ্ছে। কিন্তু তার সাজপোশাকটা ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত।
চারপাশের লোকজনও কেমন অদ্ভুত দেখতে। কারও মুখে গভীর দাগ, কারও চোখ অস্বাভাবিক বড়, কারও চেহারায় এমন কঠোরতা যে তাকালেই ভয় লাগে।
তবু আশ্চর্যের বিষয়—কেউ আমাকে দেখে অবাক হলো না।
আমি একজনের কাছে গিয়ে বললাম,
—আপনারা কোথা থেকে এসেছেন? এখানে কী হচ্ছে?
লোকটি ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
—আজ আমার মেয়ের বিয়ে।
আমি বললাম,
—বর কোথায়?
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—বর পাচ্ছিলাম না।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—বর পাচ্ছিলেন না মানে?
লোকটি আমার দিকে এক পা এগিয়ে এসে বলল,
—এখন আর বর খুঁজতে হবে না। তুমি এসে গেছ।
আমি হেসে ফেললাম।
—আমি?
—হ্যাঁ। আজ তোমার সঙ্গেই আমার মেয়ের বিয়ে হবে।
আমার হাসি মুহূর্তেই থেমে গেল।
—আপনি মজা করছেন?
লোকটি এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
—আমাদের বংশের নিয়ম এটাই।
আমি চারপাশে তাকালাম।
কেউ হাসছে না।
সবাই যেন আমার উত্তরের অপেক্ষায়।
লোকটি বলল,
—প্রতি বছর পূর্ণিমার রাতে আমাদের বংশের মেয়েদের বিয়ের দিন ঠিক হয়। সেই রাতে রাত বারোটার পর যে যুবক প্রথমবার আমাদের এই বসতিতে প্রবেশ করে, তাকেই আমাদের মেয়ের স্বামী হতে হয়।
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
ঘড়ির দিকে তাকালাম।
বারোটা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই।
আমি পিছিয়ে যেতে চাইলাম।
কিন্তু কখন যেন চারপাশের লোকগুলো আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
লোকটি বলল,
—সময় হয়ে গেছে। চল, বিয়ে করবে।
আমি একবার তার দিকে তাকালাম।
তারপর মঞ্চে বসে থাকা মেয়েটির দিকে।
অদ্ভুত ব্যাপার—মেয়েটি তখনও আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিল।
তার চোখে ভয় ছিল না।
ছিল শুধু এক ধরনের অপেক্ষা।
আমি জানি না কেন, কিন্তু সেই চোখের দিকে তাকিয়ে আমার সমস্ত ভয় ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
তারপর কী হয়েছিল, আজও পরিষ্কার মনে নেই।
শুধু মনে আছে, চারপাশে অদ্ভুত গান বাজছিল।
কেউ আমার গলায় মালা পরিয়ে দিয়েছিল।
তারপর সেই মেয়েটি আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
আমাদের বিয়ে হলো।
কেউ আনন্দে চিৎকার করল।
কেউ হাততালি দিল।
তারপর আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো একটি ছোট ঘরে।
ঘরের ভেতর মোমবাতির আলো।
মেয়েটি আমার সামনে বসে ছিল।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
—তোমার নাম কী?
সে মৃদু হেসে বলল,
—তুমি আমাকে যে নামে ডাকবে, সেটাই আমার নাম।
আমি আবার কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলাম।
কিন্তু হঠাৎ আমার মাথাটা প্রচণ্ড ভারী হয়ে এল।
চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।
তারপর আর কিছু মনে নেই।
সকালে ঘুম ভাঙতেই আমি চমকে উঠে বসে পড়লাম।
আমি আমার নিজের বিছানায়!
ঘরের জানালা দিয়ে সকালের রোদ ঢুকছে।
চারপাশে তাকালাম।
আমি একা।
গত রাতের কোনো চিহ্ন নেই।
কিছুক্ষণ ভাবলাম—সবই হয়তো স্বপ্ন ছিল।
কিন্তু হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল ডান হাতের দিকে।
আমার হাতে একটা লাল সুতো বাঁধা।
সুতোর সঙ্গে ছোট্ট একটি রুপালি ঘণ্টা।
আমি কোনোদিন এটা পরিনি।
হঠাৎ বাইরে থেকে মায়ের ডাক শুনলাম,
—এই, এতক্ষণ ঘুমাচ্ছিস কেন? তোর হাতে ওই জিনিসটা কী?
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।
ঠিক তখনই—
ঘণ্টাটা নিজে থেকেই একবার বেজে উঠল।
টুন...
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সেই রাতের মেয়েটির মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠল।
তারপর খুব ক্ষীণ একটা নারীকণ্ঠ যেন আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
“আমি অপেক্ষা করব... আগামী পূর্ণিমা পর্যন্ত।”
আমি ঘরের চারপাশে তাকালাম।
কেউ নেই।
শুধু জানালার বাইরে দূরের মাঠটা দেখা যাচ্ছে।
আর সেই মাঠের মাঝখানে—
যেখানে কোনোদিন কোনো ঘর ছিল না—
আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম কয়েকটি কুঁড়েঘর।
আর একটি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটি।
সে আমার দিকেই তাকিয়ে হাসছে।
সমাপ্ত
চাইলে এটিকে �আমি আরও বড় করে ১০–১২ অধ্যায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ ভৌতিক উপন্যাসিকা হিসেবে লিখে দিতে পারি, যেখানে �মেয়েটির আসল পরিচয় ও সেই অদ্ভুত গ্রামের রহস্য ধীরে ধীরে প্রকাশ পাবে।
সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাটা একটু বেশিই জমে গিয়েছিল। কখন যে রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে, খেয়ালই করিনি।
বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করলাম। চারপাশ তখন নিস্তব্ধ। দূরে দু-একটা কুকুরের ডাক, মাথার ওপর মেঘে ঢাকা চাঁদ—সব মিলিয়ে রাতটা কেমন অস্বাভাবিক লাগছিল।
আমাদের বাড়ি যেতে হলে কিছুদূর পাকা রাস্তা ধরে গিয়ে বিশাল একটা মাঠ পার হতে হয়।
মাঠের মাঝামাঝি যেতেই হঠাৎ চোখে পড়ল—মাঠের এক পাশে বেশ কয়েকটি কুঁড়েঘর! আর মনে হল সেখানে বিয়ের আয়োজন চলছে।আমি থমকে দাঁড়ালাম।এখানে তো কোনো ঘরবাড়ি নেই!
ভাবলাম,
0 Comments