উপন্যাস পর্ব “দুই” তুমি প্রথম তুমি শেষআফছানা খানম অথৈএর ফাঁকে কেটে গেল প্রায় সপ্তাহখানেক।প্রতিদিনের মতো আজও কলেজ ছুটির পর বান্ধবীদের সঙ্গে বাড়ির পথে রওনা হলো পারু। কলেজগেট পেরিয়ে কয়েক পা এগোতেই তার চোখ পড়ল নিলয়ের ওপর। কলেজগেটের একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে সে।পারু না দেখার ভান করে মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগল।যোবেদা মজা করতে ভালোবাসে। তাই মুখে দুষ্টুমি মাখা হাসি এনে বলল,— পারু, দেখ দেখ! নিলয় ভাই আজও এসেছে। তোর দিকে কেমন গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! ডাকব নাকি?পারু বিরক্ত হয়ে বলল,— তোর প্রয়োজন হলে তুই ডাক। আমার কোনো প্রয়োজন নেই।— উহু! পারু, তুই এত নিষ্ঠুর!— এতে নিষ্ঠুরতার কী দেখলি?— নিলয় ভাই তোকে ভালোবাসে, আর তুই কিনা তাকে পাত্তাই দিচ্ছিস না!— তোকে বলেছে নাকি, পাজিল কোথাকার?— সব কথা বলতে হয় না, বুঝে নিতে হয়। আর বকবক না করে মুখটাকে তালা মার।— ওকে, রাইট। তবে এর একটা বিহিত করে তারপর তালা মারব।তাদের কথা কাটাকাটির মাঝেই মুক্তা বলে উঠল,— তোরা থামবি? কী শুরু করে দিয়েছিস?পারু এবার যোবেদার দিকে তাকিয়ে বলল,— যোবেদা, তুই বল তো, মুক্তা সব সময় আমাকে নিয়ে এত ইয়ার্কি করে কেন?যোবেদা হেসে বলল,— ইয়ার্কি নয়, সত্যি বলছি। দেখ, নিলয় ভাই কিন্তু এখনো দাঁড়িয়ে আছে।— বেশ হয়েছে। তোকে আর ওর হয়ে ওকালতি করতে হবে না। তার প্রতি তোর দরদ যদি এতই উথলে ওঠে, তাহলে তুই গিয়ে প্রেম নিবেদন কর।— বারে! সমস্যা তো ওখানেই। সে যদি আমাকে পছন্দ করত, তাহলে তো কোনো কথাই ছিল না। আমি কি তোর মতো এত ভাবভঙ্গি দেখাতাম? সরাসরি বলতাম, ‘জান, তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি। এভাবে কড়া রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে চেহারা নষ্ট করো না।’যোবেদা একটু থেমে মুচকি হেসে বলল,— কিন্তু সমস্যা হলো, সে তোকে ভালোবাসে।পারু চোখ কুঁচকে বলল,— তুই তার কে, যে তার মনের সব খবর জানিস?— আমি তার কেউ না। তবে ইদানীং মন নিয়ে রিসার্চ করতে শুরু করেছি।মুক্তা হেসে উঠল,— ওরে আমার মনোবিজ্ঞানী! ভিতরে ভিতরে এত কিছু!যোবেদা এবার গম্ভীর হয়ে বলল,— মজা নয় পারু, সত্যি বলছি। নিলয় ভাই তোকে খুব পছন্দ করে।যোবেদার কথাগুলো পারুর হৃদয়টাকে নাড়া দিল। এতক্ষণকার হাসি-ঠাট্টার আড়ালে হঠাৎ যেন তার নিজের জীবনের বাস্তবতাটা সামনে এসে দাঁড়াল।আকুতিভরা মোলায়েম কণ্ঠে সে বলল,— যোবেদা, আমার মতো হতভাগিনী পারুর জীবনে কখনো কি এমন মজার দিন আসবে?যোবেদা অবাক হয়ে বলল,— কেন আসবে না? তুই কোনদিক থেকে অযোগ্য? সবার চেয়ে সুন্দরী, মেধাবীও বটে। নিলয় ভাইয়ের চেয়ে কম কিসে?পারু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,— শুধু সুন্দরী আর ব্রিলিয়ান্ট হলেই হয় না রে। বাবা-মায়ের সামাজিক স্ট্যাটাস থাকতে হয়। তা না হলে প্রেম নামের জিনিসটাও যেন অযোগ্য হয়ে যায়।— এসব কী বলছিস?— কৃষক করিম মিয়ার মেয়ে যতই সুন্দরী আর মেধাবী হোক, কী লাভ? কোনো ভালো পরিবারের ছেলে কি তাকে বিয়ে করতে আসবে? মোটা অঙ্কের যৌতুক দিতে পারবে না আমার বাবা। তাই স্বপ্ন দেখাটাও আমার জন্য বিলাসিতা।যোবেদা বিরক্ত হয়ে বলল,— পারু, তোর যতসব উদ্ভট চিন্তা! বাদ দে এসব বাজে প্রসঙ্গ। দেখিস, তুই একদিন অনেক সুখী হবি।পারু বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল,— যোবেদা, তোর কথা যেন সত্যি হয়।— অবশ্যই হবে। তুই মিছেমিছি চিন্তা করিস না। আর কোনো কথা নয়, বাড়ি চল।এদিকে পারুর দেরি দেখে বাড়িতে অস্থির হয়ে উঠেছেন তার মা সাজেদা বেগম।নিজের মনেই বিড়বিড় করছিলেন,— আমি একা একা আর কতদিক সামলাব? মেয়েটা থাকলে ঘরের কাজটা দেখত, আমি অন্যদিকে যেতে পারতাম। কলেজ থেকে ছেলে-মেয়েরা সেই কখন ফিরেছে, অথচ তার ফেরার নাম নেই! আমার হয়েছে যত জ্বালা!ঠিক তখনই পারু মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল।মেয়েকে দেখামাত্রই সাজেদা বেগম শাসনের সুরে বলতে শুরু করলেন,— কী হতভাগী, এত দেরি করলি কেন? তোর বাবার রাজত্ব আছে নাকি যে বসে বসে খাবি? এত বড় হয়েছিস, এখনো তোর আক্কেলজ্ঞান হলো না! তাড়াতাড়ি বই রেখে রান্নাঘরের কাজ দেখ।পারু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।মা এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন,— আমি উঠানে গেলাম। মাড়াইকল ধান মাড়াই করে চলে গেছে। তোর বাবা ক্ষেতে গেছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে। ধানগুলো তাড়াতাড়ি তুলতে হবে। আমি তন্নীকে নিয়ে যাচ্ছি।কথা শেষ করে সাজেদা বেগম উঠানের দিকে চলে গেলেন।পারু বই-খাতা রেখে রান্নাঘরে ঢুকল। রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল সে। কিন্তু মায়ের কড়া কথাগুলো বারবার মনে পড়তে লাগল। মুহূর্তেই তার মনটা খারাপ হয়ে গেল।চুলার ওপর তরকারি বসানো ছিল। মন খারাপের কারণে কখন যে সে তরকারির কথা ভুলে গেছে, নিজেই টের পায়নি।কিছুক্ষণ পর সাজেদা বেগম ঘরে ফিরে তরকারি পোড়ার গন্ধ পেয়ে চিৎকার করে উঠলেন,— পারু! তুই কোথায়? তরকারি পোড়ার গন্ধ পাচ্ছি কেন?পারু চমকে উঠে বলল,— মা, আমি ঘরেই আছি। তরকারি পোড়েনি। চুলায় আগুনটা একটু বেশি জ্বলেছে, তাই এমন গন্ধ হচ্ছে।এভাবেই ব্যস্ততাপূর্ণ দিনগুলোর মাঝে কেটে গেল আরও কয়েকটি দিন।সংসারের কাজের চাপ প্রচুর। মা-বাবা কি আর একা সব সামলাতে পারেন? তাই তাদের কষ্ট কিছুটা কমানোর জন্য পারুও নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের কাজে হাত লাগাল।তার দুই বান্ধবী নিয়মিত কলেজে যাওয়া-আসা করলেও পারু কয়েক দিন কলেজে যেতে পারল না।এদিকে প্রতিদিন কলেজের আশপাশে এসে পারুর সঙ্গে দেখা করতে ব্যর্থ হয়ে মন খারাপ করে ফিরে যাচ্ছিল নিলয়।পারু কেন কলেজে আসছে না—এমন প্রশ্নই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল তার মাথায়। কারও কাছ থেকে ঠিকমতো কোনো খবরও নিতে পারছে না।অজানা আশঙ্কায় তার ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল।অবশেষে ব্যস্ততাপূর্ণ সময়টা শেষ হলো।আজ পারু কলেজে এসেছে।তবে তার দুই বান্ধবী আজ অনুপস্থিত।প্রতিদিনের মতো যথারীতি কলেজ ছুটি হলো। পারু একাই কলেজগেট পেরিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করল।পারুকে একা দেখেই নিলয়ের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন আনন্দে নেচে উঠল। এতদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে তার কাঙ্ক্ষিত সুযোগ এসেছে।সে ধীরে ধীরে পারুর পিছু নিল।কিছুদূর যাওয়ার পর নিলয় ডাক দিল,— প্লিজ, পারু! একটু দাঁড়াও।পারু শুনেও না শোনার ভান করে হাঁটতে থাকল।নিলয় আবার ডাকল,— পারু, প্লিজ!এবার পারু পাশ ফিরে তাকিয়ে বলল,— আমাকে বলছেন?— হ্যাঁ, আপনাকেই।ততক্ষণে নিলয় তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।— পারু, তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। চলো, নিরিবিলি কোথাও বসি।— প্লিজ, আমি বসতে পারব না। চলুন, হেঁটে হেঁটে যাই। পথে আপনার যা বলার বলবেন, আমি শুনব।— ওকে, চলো।দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।কিছুক্ষণ নীরবতার পর নিলয় বলল,— পারু, তুমি অসাধারণ, অতুলনীয়, অপরূপা। সেদিন তোমার বক্তব্যটা কী চমৎকার হয়েছিল! পাটাপাটি! এমন প্রতিভা এই গ্রামে লুকিয়ে আছে, তা কখনো খেয়ালই করিনি। সেদিনই প্রথম তোমার দিকে ঠিকভাবে চোখ পড়ল।পারু মৃদু হেসে বলল,— তাহলে কি আপনি এই গ্রামের বাইরে?— না, তা কেন?— তাহলে আপনার মেধাও কম কিসে?নিলয় একটু হেসে বলল,— না, তা ঠিক। তবে আমি কি তোমার মতো শ্রেষ্ঠ বক্তা?পারু বলল,— আল্লাহ সব মানুষকে সব দিক দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেননি। আপনি বক্তৃতায় হয়তো ফিট নন, সেটা ঠিক; কিন্তু পড়ালেখায় তো অনেক ভালো।নিলয় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,— তুমি এত কিছু জানলে কী করে?— যোবেদা বলেছে। সে তো আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। শুধু তাই নয়, আরও কিছু বলেছে।— তুমি ওসব বাজে কথা বাদ দাও।— ওকে, বাদ দিলাম। এবার বলুন, আপনার কথা শেষ হয়েছে?নিলয় হেসে বলল,— বল কী! কথা তো এখনো শুরুই করিনি। শেষ হবে কী করে?পারু ভ্রু কুঁচকে বলল,— আজব তো! এতক্ষণ যে বকবক করলেন, সেগুলো কি কথা নয়?— কথা বটে। তবে আসল কথা নয়।— তাহলে আপনার আসল কথাগুলো তাড়াতাড়ি বলুন। কারণ আর একটু পথ গেলেই আমার বাড়ি।নিলয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,— ওকে, বলছি। শোনো...সে গভীর দৃষ্টিতে পারুর দিকে তাকাল।— আমি তোমাকে ভালোবাসি।পারু অবাক হয়ে বলল,— আশ্চর্য তো! কোন দুঃখে?নিলয় মৃদু হেসে বলল,— মনের দুঃখে। কারণ এই দুঃখটা মনের মানুষ ছাড়া কেউ সারাতে পারে না। আর তুমি আমার মনের মানুষ।মন-প্রাণ উজাড় করে আমি তোমাকে ভালোবাসি।পারু কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,— আমার পরিচয় জানেন?— আগে না জানলেও এখন জেনে নিয়েছি।— তবুও ভালোবাসেন?— হুম, বাসি। এতে দোষের কী দেখলে?পারু এবার গম্ভীর হয়ে বলল,— এতে কোনো দোষ নেই। তবে যা সত্যি, সেটাই বলছি। সংক্ষেপে বলছি—আপনার আর আমার পরিবারের সামাজিক অবস্থানের মধ্যে অনেক ফারাক। এই ফারাক পেরিয়ে আমাদের ভালোবাসা পরিপূর্ণতা লাভ করা সম্ভব নয়।নিলয় কিছু বলার আগেই পারু বলল,— তাই বলছি, আকাশের মানুষ আকাশেই থাকুন। মাটিতে নেমে নোংরা কাদা নিয়ে মিথ্যে খেলা খেলবেন না, প্লিজ। চলি। খোদা হাফেজ।পারু এগিয়ে যেতে চাইলে নিলয় তার পথ রোধ করে দাঁড়াল।— পারু, সত্যি আমি তোমাকে ভালোবাসি।পারু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,— প্রথম প্রথম সব পুরুষই এমন মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে। তারপর সময় বুঝে কেটে পড়ে।নিলয় অবাক হয়ে বলল,— তুমি কজন পুরুষের প্রেমে পড়েছ যে এসব বলছ?— একজন পুরুষের প্রেমেও পড়িনি।— তাহলে এত কিছু জানলে কী করে?— বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে। তাছাড়া অনেক সিনিয়র আপুর জীবনে অনেক দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেছি। সেখান থেকেই এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।নিলয় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,— ওকে। তাই। শোনো পারু, তুমি যা বলেছ, তা ধ্রুবতারার মতো সত্য। কিন্তু সব পুরুষ খারাপ নয়। আবার সব পুরুষ ভালোও নয়। আমি কিন্তু ভালো-মন্দ দুটোর মাঝামাঝি একজন মানুষ।সে একটু থেমে আবার বলল,— তবে একটা কথা দিতে পারি—আমি কখনো তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করব না। সত্যি আমি তোমাকে ভালোবাসি। এবার তোমার মতামত বলো।পারু নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,— আমি এখন কিছুই বলতে পারব না।— কেন? কেন? মন বলে কি কিছুই তোমার নেই?— অবশ্যই আছে।— তাহলে দেরি না করে হ্যাঁ অথবা না—কিছু একটা বলো।পারু একটু ভেবে বলল,— আমি আপাতত ‘না’-এর দলে।নিলয়ের মুখটা মলিন হয়ে গেল।— পারু, তুমি এখনো আমাকে বিশ্বাস করতে পারলে না?— না, পারলাম না। কারণ গুরুজনদের বাণী এত সহজে ভুলে যাওয়া যায় না—পুরুষদের সহজে বিশ্বাস করতে নেই।নিলয় মৃদু হেসে বলল,— তা অবশ্যই ঠিক। যাচাই-বাছাই করে বিশ্বাস করাই ভালো। প্লিজ, তবুও কিছু একটা বলো।পারু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,— এমনিতেই খুব টেনশনে আছি।কিছুক্ষণ নীরব থেকে মুচকি হেসে বলল,— ওকে, ভেবে দেখি কী করা যায়।পারুর কথায় নিলয়ের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।খুশি হয়ে বলল,— পারু, কাল বিকেলে বেড়াতে বের হব। তোমার সঙ্গে আমার অনেক জরুরি কথা আছে।পারু অবাক হয়ে বলল,— কী বলছেন! এত কথার পরও আরও কথা?নিলয় হেসে বলল,— হুম, জান। আরও কথা আছে। তুমি কিন্তু সময়মতো বের হবে।পারু মাথা নাড়িয়ে বলল,— ওকে।— বাই।— বাই।দুজন দুই পথে হাঁটতে শুরু করল।কিন্তু তাদের দুজনের মনেই তখন একই প্রশ্ন—আগামীকাল কী হতে চলেছে?চলবে...
0 Comments