উপন্যাস পর্ব “তিন” তুমি প্রথম তুমি শেষআফছানা খানম অথৈপরের দিন যথারীতি পারু কলেজে এলো। তখন বিরতি চলছে। ক্লাস শুরু হতে আরও প্রায় এক ঘণ্টা বাকি। তাই বান্ধবীরা সবাই মিলে কমন রুমে গল্পের আসর জমিয়ে বসেছে।কিছুক্ষণ পর যোবেদা এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল,— মুক্তা, পারু কোথায় রে?মুক্তা ভ্রু কুঁচকে বলল,— কেন? কোনো মজার খবর আছে নাকি?— আগে আমি যা জিজ্ঞেস করেছি, তার উত্তর দে।— ওই যে, জানালার ধারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে গভীর কোনো চিন্তায় ডুবে আছে।যোবেদা তাকিয়ে দেখল, সত্যিই পারু একা দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।— চল, জিজ্ঞেস করে দেখি কী হয়েছে।দুজন এগিয়ে গিয়ে পারুর পাশে দাঁড়াল।যোবেদা মৃদু হেসে বলল,— পারু, একা একা এমন নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়িয়ে কী ভাবছিস?পারু চোখ না ফিরিয়েই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,— কিছু না রে।— কিছু না? এটা তোর মনের কথা নয়। তোর চেহারাই বলে দিচ্ছে, তুই কিছু একটা ভাবছিস।পারু এবার ওদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।— যোবেদা, তোর মাথায় সব সময় কাল্পনিক বুদ্ধি কাজ করে। তাই সবকিছুতেই রহস্য খুঁজে বেড়াস।— আচ্ছা, কাল্পনিক প্রসঙ্গ বাদ দিলাম। এবার সত্যি করে বল, কী হয়েছে?পারু চুপ করে রইল।তার মুখ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে যোবেদা এবার কণ্ঠটা নরম করে বলল,— বল না পারু। আমাদের কাছে তো কিছু লুকানোর নেই।পারু কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরে ধীরে বলল,— না, তেমন কিছু হয়নি। তবে...— তবে কী? থামলি কেন? বল!— আচ্ছা, আজ থাক। অন্যদিন বলব।মুক্তা এবার এগিয়ে এসে বলল,— অন্যদিন কেন? এখনই বল।পারু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,— তোদের কাছে লুকানোর কিছুই নেই। গতকাল নিলয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। অনেক কথাও হয়েছে। সে আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে।মুক্তা আর যোবেদা দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল,— কী!পারু মৃদু স্বরে বলল,— তোরা বল, তার সঙ্গে আমার মন বিনিময় করাটা কি ঠিক হবে?যোবেদা অবাক হয়ে বলল,— কেন হবে না রে? সমস্যা কোথায়?পারু এবার একটু গম্ভীর হলো।— সমস্যা হলো, আমি গরিব কৃষক করিম মিয়ার মেয়ে। আর নিলয় স্কুলশিক্ষক আরমান স্যারের ভাগ্নে। আমাদের মধ্যে এত আকাশ-পাতাল ব্যবধান। এমন অবস্থায় কখনো প্রেম ভালোবাসা টেকে?যোবেদা সঙ্গে সঙ্গে বলল,— কেন টিকবে না? লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ—তারা কি বড়লোক ছিল? ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে অর্থ-সম্পদ, বংশ কিংবা সামাজিক অবস্থান—কোনোটাই বাধা হতে পারে না। তাদের ভালোবাসা আজও ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে আছে।পারু অসহায়ভাবে বলল,— আমার মাথায় কিছুই কাজ করছে না রে। সে আমাকে খুব গভীরভাবে ভালোবাসার কথা বলেছে। আমি না করে দিয়েছি। কিন্তু তারপরও সে হাল ছাড়ছে না।একটু থেমে পারু নিচু স্বরে বলল,— তাকে কাছে টানব, নাকি দূরে ঠেলে দেব—কিছুই বুঝতে পারছি না।যোবেদা পারুর কাঁধে হাত রেখে বলল,— এত বুঝে-শুনে লাভ কী? তুই শুধু নিজের মনকে প্রশ্ন কর। যদি তোর মনও নিলয়কে চায়, তাহলে আর ভয় কিসের?পারু দ্বিধাভরে বলল,— সাহস হচ্ছে না রে।— কেন?— যদি সে একদিন হারিয়ে যায়?যোবেদা হেসে ফেলল।— হারাবে কেন? আমার বান্ধবীটা রূপে-গুণে কারও চেয়ে কম নয়। তুই তো এক কথায় সেরা সুন্দরী। তোকে বাদ দিয়ে নিলয় ভাই অন্য কারও প্রেমে পড়বে—এটা আমি বিশ্বাসই করি না।পারু বিরক্ত হয়ে বলল,— যোবেদা, তোর রোজ রোজ ইয়ার্কি আর ভালো লাগে না।— ইয়ার্কি করছি না রে, সত্যি বলছি। নিলয় ভাই তোকে গভীরভাবে ভালোবাসে। আমার মন বলছে, সে তোকে কখনো ধোঁকা দেবে না।মুক্তা এবার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,— তুই এতটা নিশ্চিত হলি কীভাবে?যোবেদা গর্বের সঙ্গে বলল,— জানিস পারু, তোকে দেখার জন্য নিলয় ভাই প্রতিদিন কলেজ গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত। তুই যে কদিন কলেজে আসিসনি, সেদিনও এসেছিল। তোকে না দেখে বেচারার চেহারার যে কী অবস্থা হয়েছিল! মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, চাঁদের মুখে যেন গ্রহণ লেগেছে।পারু চোখ বড় বড় করে বলল,— ওহ্ গড! যোবেদা, মন সম্পর্কে এত গভীর জ্ঞান পেলি কোথা থেকে?যোবেদা হেসে বলল,— বোকা! এসব কি বই পড়ে শিখতে হয়? দুজন মানুষের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান হলেই অনেক কিছু এমনিতেই বোঝা যায়।মুক্তা এবার হেসে বলল,— যোবেদা, বুঝতে পেরেছি। তুই মনোবিজ্ঞানে বেশ পারদর্শী। এবার পারু আর নিলয়ের সম্পর্কের একটা সমাধান দে দেখি।যোবেদা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,— আমি আর কী বলব? যার যা খুশি, সে তাই করবে।মুক্তা চোখ কপালে তুলে বলল,— এতক্ষণ মন সম্পর্কে এত লেকচার দিলি, আর এখন বলছিস ‘আমি কী জানি’! এটা কেমন কথা? তুই না পারুর সবচেয়ে ভালো বন্ধু?— হুম।— তাহলে ভালো একটা সমাধান দে।যোবেদা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,— আচ্ছা, শোন। পারু, আমি বলি কী—সুযোগ মানুষের জীবনে বারবার আসে না। নিলয় ভাই যখন এতটা আন্তরিকভাবে তোকে ভালোবাসার কথা বলছে, তখন তোর উচিত তাকে একটা সুযোগ দেওয়া। কারণ এটা তোর জীবনের প্রথম সুযোগ। এই সুযোগটা হারালে পরে আফসোস করতে হতে পারে।মুক্তা হাততালি দিয়ে বলল,— থ্যাংকস, যোবেদা! তোর আইডিয়াটা মন্দ নয়। এই জন্যই তোকে বলি মনোবিজ্ঞানী!যোবেদা হেসে বলল,— পারু, নো টেনশন। আর দেরি নয়। এবার যোবেদার কথামতো প্রেমের স্কুলে নিয়মিত যাতায়াত শুরু কর!পারু লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলল।— হয়েছে, এবার ক্লাসে চল।ছুটির পর সবাই যার যার বাড়িতে ফিরে গেল।কিন্তু বান্ধবীদের কথাগুলো পারুর হৃদয়ের ভেতর কেমন যেন ঢেউ তুলতে লাগল। সারাটা পথ সে নিলয়ের কথাই ভাবল।একসময় অজান্তেই সে কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল।‘সত্যিই কি নিলয় আমাকে ভালোবাসে?’‘আমি কি তাকে ভালোবাসতে পারি?’‘ভালোবাসা কি সত্যিই এত হিসাব বোঝে?’অনেক জল্পনা-কল্পনার পর শেষ পর্যন্ত যোবেদার কথাগুলোই তার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হলো।হয়তো জীবনে কিছু অনুভূতিকে যুক্তির দাঁড়িপাল্লায় মাপা যায় না।আর সেই মুহূর্তেই পারু নিজের অজান্তে নিলয়কে তার হৃদয়ের সিংহাসনে বসিয়ে দিল।হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল নদীর ধারে নিলয়ের সঙ্গে দেখা করার কথা।কিন্তু সমস্যা একটাই—বাড়ি থেকে বের হবে কীভাবে?কয়েক মিনিট চিন্তা করার পর হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।সে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।— মা, একটা কথা বলি?মা কাজ করতে করতে বললেন,— কী বলবি বল?— আগে বলো, রাগ করবে না তো?মা মুচকি হেসে বললেন,— বোকা মেয়ে! আগে বলবি তো।পারু একটু ইতস্তত করে বলল,— মা, আমি একটু যোবেদাদের বাড়ি যাব।মা অবাক হয়ে বললেন,— কেন রে?— একটা নোট আনতে হবে।মা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,— তা বুঝলাম। কিন্তু বেলা তো প্রায় শেষ। এখন গেলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে না?— না মা। আমি যাব আর আসব। বেশি সময় লাগবে না।মা কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,— আমি এত কিছু বুঝি না। সন্ধ্যার আগেই কিন্তু ফিরবি।পারু তাড়াতাড়ি বলল,— জি মা।মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পারু বেরিয়ে পড়ল।তবে যোবেদার বাড়ির পথে নয়—তার গন্তব্য নদীর পাড়।আজ তার পরনে মিষ্টি রঙের থ্রি-পিস। এমনিতেই পারু রূপবতী, তার ওপর পোশাকটি যেন তার সৌন্দর্য আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।এদিকে নিলয় সেই কখন থেকে নদীর ধারে বসে পারুর আসার অপেক্ষা করছে।অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন তার কাছে একেকটি দীর্ঘ প্রহর।হঠাৎ দূর থেকে পারুকে আসতে দেখে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।পারু কাছে এসে দাঁড়াতেই নিলয় বিস্মিত কণ্ঠে বলল,— পারু! তুমি এসেছ?পারু মুচকি হেসে বলল,— কেন? বিশ্বাস হচ্ছে না?— না, তা না।— তাহলে এমন হা করে তাকিয়ে আছ কেন?নিলয় মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল,— তোমার চাঁদমুখটা দেখছি।তারপর একটু হেসে যোগ করল,— ওহ্! তুমি মানুষ নাকি পরী—এই প্রশ্নটাই বিবেককে করছি।পারু চোখ রাঙিয়ে বলল,— হয়েছে। আর ঢং করতে হবে না। কেন আসতে বলেছ, বলো। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে।নিলয় বলল,— কী বলো! মাত্র এলে, আর এখনই চলে যাবে? চলো, ওইখানে বসি।দুজন নদীর পাড়ের একটু নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে পাশাপাশি বসে পড়ল।নিলয়ের চোখ যেন পারুর মুখ থেকে সরছেই না।পারু কিছুক্ষণ পর অস্বস্তি নিয়ে বলল,— এই যে মিস্টার, কী হয়েছে? মুড অফ কেন? এভাবে পলকহীন চোখে তাকিয়ে কী দেখছেন? পাগল হয়ে গেলেন নাকি?নিলয় মৃদু হেসে বলল,— তুমি ঠিকই বলেছ। সত্যিই আমি পাগল হয়েছি।পারু অবাক হওয়ার ভান করে বলল,— আজব তো! তাহলে তো এখনই আপনাকে পাগলা গারদে পাঠাতে হবে।— তা ঠিক। তবে একটু ব্যতিক্রম আছে।— কী ব্যতিক্রম?— আমি পাগল হয়েছি ঠিকই, কিন্তু এ পাগল সে পাগল নয়। আমি তোমার রূপের পাগল। আমাকে পাগলা গারদে না পাঠিয়ে যদি পারুর রূপের গারদে পাঠাও, তাহলে আমি ঠিক ঠিক ভালো হয়ে যাব।পারু হেসে বলল,— মিস্টার নিলয় সাহেব, মেয়েদের পটানোর ভালো ডায়ালগ শিখেছেন দেখছি! আপনারা ছেলেরা পারেনও বটে!নিলয় একটু গম্ভীর হয়ে বলল,— পারু, তুমি কী বললে! এটা মেয়েদের পটানোর ডায়ালগ নয়।— তা নয় তো কী?— এটা ভালোবাসার কথা। আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি।পারু চোখ সরিয়ে বলল,— এই ডায়ালগ আর কজনকে বলেছেন?নিলয় দৃঢ় কণ্ঠে বলল,— আর কাউকে নয়। শুধু তোমাকে।— তবুও তোমাদের বিশ্বাস করা যায় না।নিলয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,— পারু, তুমি যে কী! শুধু অবিশ্বাস আর অবিশ্বাস। একবার আমাকে বিশ্বাস করে দেখো না। একবার ভালোবেসে দেখো। আমি কথা দিচ্ছি, তুমি সুখী হবে।পারু হেসে বলল,— ও গড! এত ভালোবাসা আমি কোথায় রাখব?তারপর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,— অনেক কথা হয়েছে। এবার আমি যাই।নিলয়ও তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।— কী বললে! তুমি কোনো উত্তর না দিয়েই চলে যাবে?পারু ফিরে তাকাল।— কী উত্তর চাও?নিলয়ের চোখে তখন অদ্ভুত এক আকুতি।— তুমি আমাকে কতটুকু ভালোবাস?পারু ইচ্ছে করেই তাকে একটু পরখ করতে চাইল।মুখ গম্ভীর করে বলল,— একটুও না।নিলয়ের মুখ মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল।— সত্যি বলছ?— হুম। সত্যি।নিলয় কষ্টভরা কণ্ঠে বলল,— ওহ্ পারু! তুমি এত নিষ্ঠুর হতে পারলে? আমি তোমাকে গভীরভাবে ভালোবাসি, আর তুমি কিনা আমাকে একটুও ভালোবাসো না!কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল,— পারু, সত্যি বলছি, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। তুমি আমার পাশে না থাকলে আমার ডাক্তারি পড়াটাও যেন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তুমি কি চাও, তোমার ভালোবাসার মানুষটা ভেঙে পড়ুক?পারুর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।সে ধীরে বলল,— না, তা চাই না।— তাহলে কিছু একটা বলো।পারু মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে বলল,— নিলয়, সব কথা মুখে বলতে হয় না। কিছু কথা বুঝে নিতে হয়।নিলয় তাকিয়ে রইল।পরু খুব আস্তে বলল,— আমিও তোমাকে ভালোবাসি।নিলয়ের চোখে যেন মুহূর্তেই আলো জ্বলে উঠল।— সত্যি?— হুম, সত্যি।— এবার খুশি তো?নিলয় হেসে বলল,— খুশি? মহাখুশি!পারুও হেসে ফেলল।নদীর জলে তখন বিকেলের শেষ আলো ঝিকমিক করছে। দুজনের নীরবতার মাঝেও যেন অদৃশ্য কোনো প্রতিশ্রুতি জন্ম নিল।কিন্তু তারা কেউই জানত না—এই নতুন ভালোবাসার পথ সামনে কতটা কঠিন, কতটা কণ্টকাকীর্ণ।নিলয় মৃদু স্বরে বলল,— চলো, এবার তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।পারু মাথা নেড়ে বলল,— হ্যাঁ, চলো।দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।নদীর পাড়ের বাতাস তাদের দুজনের মনের গোপন কথাগুলো যেন সঙ্গে করে নিয়ে গেল দূর অজানায়।চলবে...
0 Comments