উপন্যাস পর্ব “চার” তুমি প্রথম তুমি শেষআফছানা খানম অথৈপারুর প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে প্রায় সপ্তাহখানেক আগে। এতদিন কলেজ বন্ধ থাকার পর আজ শনিবার নতুন করে কলেজ খুলেছে। দীর্ঘ বিরতির পর তিন বান্ধবীর আবারও কলেজে আগমন। একে অপরকে দেখে তাদের আনন্দের যেন শেষ নেই। কুশল বিনিময় আর হাসি-ঠাট্টা শেষে দেখা গেল, ক্লাস শুরু হতে এখনো বেশ কিছুটা সময় বাকি।তাই তিন বান্ধবী মিলে কলেজের মাঠে কিছুক্ষণ পায়চারি করতে লাগল। ঘণ্টা পড়তেই সবাই যে যার ক্লাসের দিকে ছুটল।ছুটির পর তিন বান্ধবী একসঙ্গে বাড়ির পথে রওনা হলো। কলেজ গেট পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই হঠাৎ যোবেদার চোখ পড়ল নিলয়ের দিকে। কলেজ মাঠের পূর্ব কোণে একটি বড় গাছের ছায়ায় হেলান দিয়ে বসে আছে সে।যোবেদা খিলখিল করে হেসে বলল,—পারু, দেখ দেখ, নিলয় ভাই!পারু চমকে তাকাল।—কোথায়?—ওই যে, মাঠের পূর্ব কোণে গাছের ছায়ায় বসে আছে। মনে হচ্ছে তোর জন্যই অপেক্ষা করছে।—কী করে বুঝলি?যোবেদা মুচকি হেসে বলল,—সবকথা কি মুখে বলতে হয়? কিছু কথা চোখ দিয়েও বুঝে নিতে হয়। মেঘে মেঘে বেলা যে অনেক দূর গড়িয়ে গেছে, সেটা আমরা বুঝে গেছি। আজ নিলয় ভাইকে আর ছাড়ছি না।মুক্তা কৌতূহলী হয়ে বলল,—কী করবি?যোবেদা চোখ টিপে বলল,—মিষ্টি খেয়ে তবে ছাড়ব।—আইডিয়াটা মন্দ না। তবে বাপু, আমি কিন্তু কিছু বলতে পারব না।—তোকে কিছু বলতেই হবে না। যা বলার আমি বলব। তুই শুধু আমার সঙ্গে থাকবি।—ঠিক আছে। চলো।তিন বান্ধবী দ্রুত পায়ে নিলয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।আচমকা যোবেদা বলল,—নিলয় ভাই, একা একা এখানে কী করছেন?নিলয় কিছুটা নার্ভাস হয়ে উত্তর দিল,—না, তেমন কিছু না। গাছের ছায়ায় বসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম আরকি।—তা বুঝলাম। কিন্তু কলেজ মাঠে কেন?—ইয়ে... মানে... আসলে...যোবেদা হেসে বলল,—আর ইয়ে-টিয়ে করতে হবে না। বুঝে গেছি আপনি কেন এসেছেন। তবে একটা কথা আছে।—কী কথা?—মুরব্বিদের মুখে প্রায়ই শুনেছি, শুভ কাজের আগে মিষ্টিমুখ করতে হয়। তা না হলে নাকি ফলাফল অশুভ হয়।নিলয় হেসে ফেলল।—তার মানে তোমরা মিষ্টি খেতে চাও, তাই তো?—হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন।—তো চলো।কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা কাছের একটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসল।নিলয় বলল,—বলো, কী খাবে?তিনজনের কেউই প্রথমে কিছু বলল না।নিলয় আবার বলল,—কী হলো? শুধু মিষ্টিই খাবে, আর কিছু না?যোবেদা গম্ভীর মুখ করে বলল,—আজকের জন্য মিষ্টি হলেই চলবে।—ঠিক আছে, তাহলে অর্ডার করি।নিলয় ওয়েটারকে মিষ্টি, কফি ও কিছু নাশতার অর্ডার দিল। খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে তারা রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এলো।বের হতেই যোবেদা হঠাৎ মুক্তার হাত ধরে বলল,—চল মুক্তা, আমরা এবার কেটে পড়ি।মুক্তা অবাক হয়ে বলল,—কেন রে?যোবেদা চোখের ইশারায় নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,—বোকা, কিছু বুঝিস না? দেখছিস না, নিলয় ভাই কীভাবে পারুর দিকে তাকিয়ে আছে? আমাদের সামনে তো আর মনের কথাগুলো বলতে পারছে না।মুক্তা মুচকি হেসে বলল,—হুম, তাই তো। চল।দুজন কিছুটা দূরে গিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল।এখন সেই জায়গায় শুধু পারু আর নিলয়।নিলয় চারদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,—পারু, তোমার বান্ধবীরা কোথায় গেল?—হয়তো অন্যদিকে গেছে।নিলয় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।—যাক বাবা, বাঁচা গেল! এই সুযোগে চলো, দীঘির পাড়ের ওই গাছতলায় বসে একটু গল্প করি।পারু মৃদু হেসে বলল,—হুম, চলো।দুজন পাশাপাশি গিয়ে গাছের ছায়ার নিচে বসল।কিছুক্ষণ নীরবতার পর নিলয় বলল,—পারু, কেমন আছ?পারু মাটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,—গরিবের আবার ভালো থাকা! কোনো রকমে বেঁচে আছি, এই আর কী। তুমি কেমন আছ?নিলয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,—আমিও মোটেও ভালো নেই।পারু অবাক হয়ে তাকাল।—কেন? কী হয়েছে?—কিছু হয়নি।—তাহলে যে বললে মোটেও ভালো নেই?নিলয় মৃদু হেসে বলল,—এই কদিন তোমাকে না দেখে খুব টেনশনে ছিলাম। পড়ালেখায় একটুও মন বসাতে পারিনি।পারুর ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।—ওহ! বিয়ে হওয়ার আগেই এত ভালোবাসা? তা-ও আবার কয়েক দিনের জন্য?নিলয় এবার গম্ভীর হয়ে বলল,—কয়েক দিনের জন্য নয়, পারু। চিরদিনের জন্য। শিক্ষা জীবন শেষ করে সত্যিই আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।পারু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,—বিয়ে হওয়ার আগেই এত গল্প মারা ঠিক না। তাছাড়া রেজাল্ট বের হওয়ার পর যখন শহরে গিয়ে ডাক্তারি পড়বে, তখন এই পারু নামের গরিব কৃষকের মেয়েটার কথা মনে থাকবে তো?নিলয় চুপ করে রইল।পারু আবার বলল,—শহরে গেলে তোমার চারপাশে কত সুন্দরী, শিক্ষিত মেয়ে থাকবে। তখন হয়তো আমার কথা মনেই পড়বে না।নিলয় মাথা নাড়িয়ে বলল,—পারু, অনেক লেকচার হয়েছে। এবার থামো। আর আমাকে অন্য আট-দশজন পুরুষের সঙ্গে তুলনা করো না। আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি।পারু শান্ত গলায় বলল,—নিলয়, শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে কাউকে ভালোবাসা ঠিক নয়। ভালোবাসার সঙ্গে বাস্তবতাকেও দেখতে হয়। পরিবার, সামাজিক অবস্থান—সবকিছুই ভাবতে হয়। এখনো সময় আছে। চাইলে তুমি তোমার অবস্থানে ফিরে যেতে পারো। আমি কিছু মনে করব না।নিলয় বিস্মিত চোখে পারুর দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর মৃদু হেসে বলল,—পারু, তোমার কথা যত শুনি, ততই তোমার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। প্রেম সম্পর্কে এত মূল্যবান কথা শিখলে কার কাছ থেকে?পারু মাথা নিচু করে বলল,—কারও কাছ থেকে নয়। আমার ভালোবাসাই আমাকে এসব অভিজ্ঞতা অর্জন করার তৌফিক দিয়েছে। তাছাড়া বাস্তব জীবনে এমন ঘটনা অহরহ ঘটে।একটু থেমে সে বলল,—প্রেমে ব্যর্থতা, বিয়েতে বাধা কিংবা প্রতারণার কারণে অনেক ছেলে-মেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কেউ কেউ তো নিজের জীবন নিয়েও ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই তোমার সামনে কয়েকটি জরুরি কথা তুলে ধরলাম। এখন সিদ্ধান্ত তোমার—তুমি কী করবে?নিলয় কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,—আমার সিদ্ধান্ত আমি কবিতার ছন্দে ছন্দে বলছি।প্রথম ও শেষ ভালোবাসানিলয় রহমানতুমি আমার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা,তাই তো স্মরণ করি তোমায় প্রতিটি নিশ্বাসে ভাসা।বুঝি না কেন সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন এ ভালোবাসা,যার টানে ছুটে চলে তরুণ-তরুণীর মন, বাড়ে হতাশা।তবুও থামে না মানুষের ভালোবাসা,এক বাক্যে বলে বেড়ায়—তুমিই আমার ভালোবাসা।ভালোবাসি তোমায়—শুধু এই করেছি পণ,সে কথা কি শোনে না তোমার তনু ও মন?তোমার রূপে মগ্ন আমি, দেখি না আর কিছু,তাই তো ছায়ার মতো ঘুরি তোমার পিছু পিছু।পলকজুড়ে হার মানে তোমার রূপের লাবণ্যতা,তাই তো বুঝিয়ে দিতে চাই আমার প্রেমের গভীরতা।তুমি আমার স্বপ্নভরা সব জনমের আশা,তুমি আমার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা।কবিতা শেষ হতেই পারুর মনটা আনন্দে নেচে উঠল। ভালোবাসার দোলনায় দুলতে দুলতে সে যেন কিছুক্ষণের জন্য বাস্তব জগৎ ভুলে গেল।তাকে চুপচাপ থাকতে দেখে নিলয় আলতো করে তার দিকে তাকিয়ে বলল,—পারু, কী হলো? কিছু বলছ না যে! কবিতা কেমন হলো?পারু মুচকি হেসে বলল,—পাত্তাই! দারুণ হয়েছে। আমার মন বলছে, নিয়মিত চর্চা করলে তুমি একদিন অনেক বড় কবি হতে পারবে।নিলয় হেসে বলল,—বেশ হয়েছে। তোমাকে আর ইয়ার্কি মারতে হবে না।—ইয়ার্কি নয়, সত্যি বলছি।—বেশ হয়েছে। সত্যিটা বাদ দিয়ে এবার মিথ্যাটা বলো।—কী মিথ্যা?—আমার ভালোবাসার কথা তোমার মনে থাকবে তো?পারু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,—অবশ্যই মনে থাকবে। কিন্তু তোমার মনে থাকবে কি না, সেটাই তো মূল বিষয়।নিলয় সঙ্গে সঙ্গে বলল,—মনে থাকবে না মানে? একশবার থাকবে, হাজারবার থাকবে। যুগের পর যুগ থাকবে। এরপরও কি বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমি তোমাকে ভালোবাসি?পারু শান্ত গলায় বলল,—নিলয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের হিসাব আমি বুঝি না। যেদিন তোমার ভালোবাসা পরিপূর্ণতা লাভ করবে, সেদিন বুঝব তুমি সত্যিকারের প্রেমিক। তার আগে নয়।—কেন?—কারণ প্রেমে পড়লে অনেক পুরুষই এমন নীতিবাক্য শোনায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই সেই কথাগুলো ভুলে যায়।নিলয় মৃদু হেসে বলল,—ঠিক আছে, পারু। সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করো।—ঠিক আছে। এবার উঠো।এমন সময় আড়াল থেকে মুক্তা ও যোবেদা এসে হাজির হলো।যোবেদা হেসে বলল,—পারু, এখনো তোদের প্রেমালাপ শেষ হয়নি?নিলয় মজা করে বলল,—নো ম্যাম, এখনো হয়নি।মুক্তা চোখ বড় বড় করে বলল,—হোয়াট! এতক্ষণ কী করলেন?নিলয় হেসে বলল,—আর কী করব ম্যাম? পারু শুধু নারীদের পক্ষ নিয়ে তর্ক করে চলেছে। কোনো রকমে তর্কে জিততেই পারছি না।যোবেদা গর্বের সঙ্গে বলল,—ভালোই তো! পারবেন কেন? সে যে বিতর্ক সভার শ্রেষ্ঠ বক্তা। যার সঙ্গে যুক্তিতে পেরে ওঠা চারটে খানি কথা নয়!তারপর পারুর দিকে তাকিয়ে বলল,—তো ভাইয়া, আপনারা আরও কিছু সময় প্রেমের গীত রচনা করুন। আমরা গেলাম।নিলয় তাড়াতাড়ি বলল,—হ্যালো ম্যাম, কোথায় যাচ্ছেন?যোবেদা উত্তর দিল,—কোথায় আবার? বাড়িতে।নিলয় মজা করে বলল,—বান্ধবীকে নিয়ে যাবেন না?যোবেদা হেসে বলল,—আপনি তো এখনো তাকে ছুটি দিচ্ছেন না। সে যাবে কী করে?নিলয় এবার একটু গম্ভীর অথচ হাস্যরস মিশ্রিত স্বরে বলল,—আপাতত নিয়ে যান। কারণ এখনো তাকে কাছে রাখার সময় হয়নি। যখন সময় হবে, তখন ঠিকই রেখে দেব। তখন শত চেষ্টা করলেও নিতে পারবেন না।যোবেদা হেসে বলল,—বাহ! তাহলে আজকের মতো বিদায়।—ভালো থাকবেন সবাই।—খোদা হাফেজ।তিন বান্ধবী বাড়ির পথ ধরল।আর নিলয় দাঁড়িয়ে রইল সেই দীঘির পাড়ে—চোখের সামনে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া পারুর অবয়বটির দিকে তাকিয়ে।তার চোখে তখন একটাই স্বপ্ন—পারু শুধু তার প্রথম ভালোবাসা নয়, শেষ ভালোবাসাও হবে।চলবে...
0 Comments