উপন্যাস পর্ব \"দশ\" তুমি প্রথম তুমি শেষআফছানা খানম অথৈপারু আবার মজা করে বলল——যোবেদা, প্রবাসী পুরুষ সম্পর্কে আমার এক ভাবীর একটা চমৎকার গল্প আছে।—কী গল্প?—একদিন জুয়েলার্সে আমার সেই ভাবীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমি নাকফুল বানাতে গিয়েছিলাম, আর ভাবী কানের দুল কিনতে এসেছিলেন। দুলগুলো দেখে আমি হেসে বললাম——ভাবী, কানের দুলগুলো আপনাকে দারুণ মানিয়েছে।ভাবী মুচকি হেসে বললেন——সত্যি?—হুম, ভাবী। এখনই ভিডিও কলে ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলুন। ভাইয়াও ঠিক আমার মতোই বলবে।ভাবী বিরক্ত হয়ে বললেন——দূর ছাই! এসব ভিডিও কলে কথা বলে লাভ কী? শুধু শুধু টেনশন বাড়ে।আমি অবাক হয়ে বললাম——টেনশন কিসের, ভাবী? আপনি তো মহাসুখে আছেন। ভাইয়া টাকা পাঠায়, আর আপনি বসে বসে খান। পছন্দমতো শাড়ি, চুড়ি, গহনা বানান। এর চেয়ে সুখ আর কী হতে পারে?ভাবী তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন——মিস পারু, এখনো তো তুমি আমার বয়সে পৌঁছাওনি। তাই এসব বুঝবে না। সময় হলে ঠিকই বুঝতে পারবে। প্রবাসী স্বামীর সংসার করা একজন নারীর জন্য কতটা যন্ত্রণার, কতটা কষ্টের, কতটা নিঃসঙ্গতার—তা যার ওপর দিয়ে যায়, সে ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।ভাবী একটু থেমে আবার বলেছিলেন——নবী করিম (সা.)-এর যুগে স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘ বিচ্ছেদ নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। অথচ আজকের প্রবাসী জীবনে চার-পাঁচ বছর, কখনো তারও বেশি সময় স্বামী-স্ত্রী আলাদা থেকে যায়। টাকার অভাব হয়তো থাকে না, কিন্তু স্বামীর সান্নিধ্য থাকে না। সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মানুষটাকে কাছে পাওয়া যায় না। বলো, এটা কি সহজ জীবন?ভাবীর কণ্ঠ তখন ভারী হয়ে এসেছিল।—স্বামী দূরে থাকলে একজন নারীকে কতটা নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হয়, তা তুমি এখন বুঝবে না। যখন তোমার নাগর আসবে, তখন সবকিছু বুঝবে। তবে একটা কথা মনে রেখো—যত বড়লোকই হোক, প্রবাসী পুরুষকে কখনো বিয়ে করো না।যোবেদা হতাশ কণ্ঠে বলল——এরপরও তোরা আমাকে প্রবাসী পুরুষকেই বিয়ে করতে বলবি!পারু বন্ধুর হাত ধরে বলল——উপায় কী? অভিভাবকের সিদ্ধান্তও তো মেনে চলতে হয়। তবে তুই টেনশন করিস না। কাল আমরা তোদের বাড়িতে যাব। দেখি চাচা-চাচিকে বুঝিয়ে কিছু করা যায় কি না।ঠিক তখনই ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠল।দপ্তরি এসে জানাল,—অফিসে জরুরি মিটিং বসেছে। আজ আর কোনো ক্লাস হবে না।খবর পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা সবাই কলেজ থেকে বেরিয়ে পড়ল।এমন সময় একজন ডাকপিয়ন এসে জিজ্ঞেস করল——আফা, আপনাদের মধ্যে পারু কে?পারু এগিয়ে গিয়ে বলল——আমি পারু। কেন?—আপনার একটা চিঠি আছে। এই নিন।পারু দ্রুত চিঠিটা হাতে নিয়ে বইয়ের ভেতর লুকিয়ে ফেলল।মুক্তা কৌতূহলী হয়ে চিঠিটা কেড়ে নিতে চাইল, কিন্তু পারু সুযোগ দিল না।—বাড়ি গিয়ে দেখব।বলেই সে দ্রুত বাড়ির পথে রওনা হলো।চিঠিটা হাতে পাওয়ার পর থেকেই তার বুকের ভেতর যেন আনন্দের ঢেউ উঠছিল। বাড়ি পৌঁছেই আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঘরের দরজা বন্ধ করে কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল।চিঠি পড়তে পড়তে পারুর দু’চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল।চিঠির প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃদয়ের গভীরে গিয়ে স্পর্শ করছিল।রাত গভীর হলো।চারদিকে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ পারুর চোখে ঘুম নেই।সে নিলয়ের চিঠির উত্তর লিখতে বসেছে।“ওগো আমার হৃদয়ের প্রদীপ নিলয়,আমার হৃদয়-সমুদ্রে জমে থাকা অসংখ্য সুগন্ধি ফুলের সুবাস মাখা, বহুদিনের আবেগ আর ভালোবাসার সবটুকুই তোমার জন্য।আশা করি, পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত আছ। বিধাতা যেন তোমার সব মনোবাসনা পূর্ণ করেন—এই কামনাই করি।যাক, নিলয়, তোমার চিঠিটা যথাসময়ে আমার হাতে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু কীভাবে তার জবাব দেব, ভেবে পাচ্ছিলাম না।তোমার চিঠিটা পড়ার পর আমার দু’চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়েছে।জানি, তুমি প্রশ্ন করবে—কেন?তার জবাব দিচ্ছি।নিলয়, তোমার পুরো চিঠিটাই ছিল অপূর্ব ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। তাই মনে একটি প্রশ্ন জেগেছে—তোমার এই অপূর্ব ভালোবাসা কি আমার হৃদয়ে চিরস্থায়ী হবে? নাকি আমার ঘুমন্ত হৃদয়টাকে জাগিয়ে দিয়ে তুমি একদিন চলে যাবে বহু দূরে?নিঝুম নিশীথ রাত।কেউ জেগে নেই। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু জেগে আছে তোমার পারু।জেগে জেগে কাগজের পাতায় কলমের তুলিতে তোমার জন্য প্রেমের গীত রচনা করছি।নিলয়, তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমারও খুব কষ্ট হচ্ছে। ইচ্ছে করছে উড়ন্ত পাখির মতো উড়ে চলে যাই তোমার কাছে। কিন্তু পারছি না। উড়ব কী করে? আমার তো ডানা নেই!জানি না, আল্লাহপাক কখন তোমাকে আবার আমার সম্মুখে এনে দাঁড় করাবেন।নিলয়, তোমার বিরহ আমাকে আর শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। আমার মন শুধু তোমার কাছেই ছুটে যেতে চাইছে।আজ তোমাকে একটা খাঁটি সত্য কথা বলি—আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি।তোমার জন্য আমার হৃদয়-সমুদ্রে যে অপূর্ব ভালোবাসার সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনোদিন শেষ হবে না। কারণ তুমি আমার প্রথম ভালোবাসার মানুষ।তোমার শত সহস্র আবেগপূর্ণ অনুরোধের পর অবশেষে আমার মনের সত্য কথাটা এই চিঠির মাধ্যমে তোমার কাছে প্রকাশ করলাম।নিলয়, আমার ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই, কোনো ছলনা নেই, কোনো মিথ্যা নেই। আমার সুপ্ত-জাগ্রত হৃদয়ে আছ শুধু তুমি—আর তুমি।আর সেই তুমি যদি কোনোদিন ভোজবাজির মতো হঠাৎ হারিয়ে যাও, সেদিন আমার বেঁচে থাকার সব অর্থ হারিয়ে যাবে।কথাটি মনে রেখো।নিলয়, তুমি কখন আসবে?তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। পূজোর ছুটিতে আসবে বলেছ। দেখো, আবার অন্য কাউকে নিয়ে আমাকে ভুলে থেকো না।শত ব্যস্ততার মাঝেও বারবার মনে পড়ে সেই আনন্দময় মুহূর্তটির কথা, যে মুহূর্তে তুমি প্রথম আমাকে ভালোবাসার কথা বলেছিলে।সেই মুহূর্তটি আবার কবে ফিরে আসবে?বলো, মোর প্রিয়তম।আর বিশেষ কী লিখব?তুমি একজন নামী-দামী ও আদর্শ ডাক্তার হও—খোদাপাকের কাছে এই প্রার্থনাই করি।সবশেষে তোমার দীর্ঘায়ু কামনা করছি।বেঁচে থাকো যুগ যুগ ধরে।আজ এ পর্যন্তই।বিদায়।খোদা হাফেজ।ইতিতোমারই মনের মাধুরীতে বসে থাকাপারু।”পারু যথাসময়ে চিঠিটা পোস্ট করে দিল।আজ শুক্রবার। কলেজ বন্ধ।লাঞ্চের পর যোবেদাদের বাড়িতে যাওয়ার কথা। কিন্তু মুক্তা এখনো আসেনি। তাই পারু কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখে তন্দ্রা নেমে এল।ঠিক তখনই মুক্তা এসে হাজির।পারুর মায়ের সঙ্গে দেখা হলে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,—চাচি, পারু কোথায়?পারুর মা বললেন——ভেতরে যাও মা। পারু তার ঘরে আছে।মুক্তা ঘরে গিয়ে দেখল, পারু এখনো শুয়ে আছে।সে পারুর শরীরটা নাড়িয়ে বলল——পারু, তুই এখনো শুয়ে আছিস?পারু চোখ মেলে বলল——বারে, আমার দোষ কী? তোর দেরি দেখে শুয়ে পড়লাম।মুক্তা বলল——বেশ হয়েছে। আর কথা নয়। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।—ওকে, তুই একটু দাঁড়া।পারু উঠে প্রস্তুত হয়ে নিল।পারু, যোবেদা ও মুক্তা—তিনজনের বাড়িই একই গ্রামে। একজনের বাড়ি থেকে অন্যজনের বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি নয়। হেঁটেই যাওয়া যায়।পারু ও মুক্তা যোবেদাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো।কিছুদূর যাওয়ার পর তাদের সামনে একটি দোকান পড়ল।দোকানটি লোকজনে ভর্তি। কেউ চা পান করছে, কেউ হাসি-তামাশায় ব্যস্ত।আর দোকানের এক পাশে পায়ের ওপর পা তুলে বসে সিগারেট টানছে মাতব্বরের নষ্ট ছেলে হারুন। নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল। বড় বড় চোখে সে এমনভাবে মেয়েদের দিকে তাকাচ্ছে, যা দেখলেই গা শিউরে ওঠে।পারু ও মুক্তা দোকানটি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় হারুনের কু-দৃষ্টি তাদের ওপর গিয়ে পড়ল।দৃশ্যটি চোখে পড়তেই দুজনেই নিচু স্বরে দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে দ্রুত এগিয়ে গেল।হারুনের চোখের আড়ালে চলে যাওয়ার পর মুক্তা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল——পারু, দেখেছিস হারুন ভাই কীভাবে বাঁকা চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল? ওহ গড! আজ আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন।পারু চুপ করে রইল।মুক্তা আবার বলল——চল, চল। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে হবে। একটা কথা বুঝি না—লোকজন কেন চুপ করে আছে? ওকে জেলে দিচ্ছে না কেন? এত মেয়ের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে, অথচ সবাই নীরব!পারু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল——লোকজনই বা কী করবে? তার বাবা এই এলাকার মাতব্বর। গরিব-দুঃখী মানুষকে শোষণ করে আজ বিরাট বড়লোক হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কিংবা হারুনের বিরুদ্ধে মামলা করে কেউ কি শান্তিতে থাকতে পারবে? আমার তো মনে হয় না।—তাই বলে সবাই চুপ থাকবে?—বাপ-ছেলে দুজনেই একই রকম। ছেলে অন্যায় করলে বাবা তাকে শাস্তি দেওয়ার বদলে প্রশ্রয় দেয়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে না—‘Like father, like son.’মুক্তা তিক্ত হেসে বলল——ঠিকই বলেছিস। অভিভাবকই যদি নষ্ট হয়, সন্তান ভালো হবে কী করে?কথা বলতে বলতে তারা কখন যে পথ পেরিয়ে যোবেদাদের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছেছে, নিজেরাও টের পেল না।পারু বলল——মুক্তা, থাম! থাম! বাড়ি এসে গেছে।তারা ভেতরে প্রবেশ করল।বৈঠকখানায় যোবেদার মায়ের সঙ্গে দেখা হলো। দুজনেই বিনয়ের সঙ্গে সালাম দিল।তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন——পারু, মুক্তা, তোমরা কেমন আছ?—আলহামদুলিল্লাহ, চাচি। ভালো আছি।—তোমরা যোবেদার ঘরে গিয়ে বসো। আমি রহিমাকে চা-নাশতা দিতে বলছি।পারু সঙ্গে সঙ্গে বলল——চাচি, আমরা যোবেদার ঘরে যাব না। আপনি একটু বসুন। যোবেদার বিয়ের ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে এসেছি।চাচি অবাক হয়ে তাকালেন।—কী বলছ তোমরা? যোবেদার বিয়ের আবার কী হলো?—জ্বি চাচি, কিছু হয়নি।—তা হলে তোমরা যে বললে—পারু একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল——চাচি, অপরাধ নেবেন না। যোবেদার বয়স এখনো আঠারো বছর পূর্ণ হয়নি। এখনই বিয়েটা না দিলে কি হয় না?চাচি চমকে উঠে বললেন——কী বলছ তোমরা? বিয়ের সবকিছু ফাইনাল হয়ে গেছে। এখন এসে বলছ বিয়ে বন্ধ করতে! না, তা কখনো সম্ভব নয়।পারু শান্তভাবে বলল——চাচি, আপনারা চাইলে সবকিছুই সম্ভব। যোবেদার বয়স এখনো কম। এই বয়সে বিয়ে হলে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে। তার সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। এখন বিয়ে হলে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। সংসার সামলানোর ক্ষেত্রেও নানা সমস্যায় পড়বে। কারণ এই বয়সে একজন মেয়ে সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত নাও হতে পারে।পারু একটু থেমে বলল——এটা শুধু আমার কথা নয়, চাচি। অনেক জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ মানুষও মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই যোবেদার ভালোর কথা ভেবেই আমরা এই অনুরোধ করতে এসেছি।যোবেদার মা এবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন——পারু, বয়সের যে কথা বলছ, আমার কাছে সেটা খুব একটা যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না। এটা তোমাদের যুগের কথা। আমাদের সময়ে তো বারো-তেরো বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যেত। কই, তখন তো কারও এত সমস্যা হয়েছে বলে শুনিনি!পারু চুপ করে শুনছিল।তিনি আবার বললেন——আর পড়াশোনার কথাও বলছ। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব মেয়েকেই তো শেষ পর্যন্ত ঘর-সংসারের কাজ করতে হয়। তাহলে মেয়েদের এত পড়াশোনা করিয়ে লাভ কী?পারু এবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল——চাচি, লাভ-লোকসানের হিসাব দিয়ে শিক্ষা বিচার করা যায় না। একটা সুন্দর কথা আছে—‘তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’ তাই মেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলা খুবই জরুরি।যোবেদার মা বিরক্ত হয়ে বললেন——আরে বাবা, আমরা এত কিছু বুঝি না। মেয়ে বড় হয়েছে, ভালো পাত্র পেয়েছি—ব্যস, বিয়ে দিয়ে দেব। এর বাইরে আমরা বেশি কিছু বুঝতে পারব না।পারু বলল——চাচি, আপনারা যাকে ভালো পাত্র বলছেন, যোবেদা কিন্তু তাকে মোটেও পছন্দ করে না।তিনি রেগে গিয়ে বললেন——পারু, তোমরা এসব কী বলছ! আমরা আমাদের পছন্দে মেয়ের বিয়ে দেব। এখানে আবার মেয়ের পছন্দ-অপছন্দ কী?একটু থেমে তিনি আবার বললেন——তাছাড়া পছন্দ না হওয়ার মতো সে কী দেখেছে?পারু কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল——চাচি, যদি কিছু মনে না করেন, আসল কথাটা বলি?—হ্যাঁ, বলো। কিছু মনে করব না।—সত্যি বলতে কী, যোবেদা প্রবাসী পুরুষকে বিয়ে করতে চায় না। তার ওপর পাত্রটি বয়সে অনেক বড় এবং তেমন শিক্ষিতও নয়। এটাই তার আপত্তির মূল কারণ।চাচি এবার আরও কঠোর স্বরে বললেন——শোন পারু, পাত্র বয়স্ক আর অশিক্ষিত—তাতে কী হয়েছে? সে তো অনেক টাকার মালিক! শহরে তার নিজস্ব বাড়ি আছে, গাড়ি আছে। আমরা ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এমন পাত্র হাতছাড়া করা উচিত নয়।তিনি আরও বললেন——যোবেদা আমাদের মেয়ে। তার ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব আমাদের। আমরা তার ভালোর কথাই চিন্তা করে প্রবাসী পুরুষের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছি। এই পাত্রের সঙ্গেই যোবেদার বিয়ে হবে। এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।কণ্ঠ আরও কঠোর করে তিনি বললেন——অতএব, তোমরা আর এ ব্যাপারে কিছু বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে না। সাবধান!পারু আরও কিছু যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইল।কিন্তু চাচির শেষ কথাগুলো তার মুখ বন্ধ করে দিল।মুক্তাও বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে আর কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই।তাই তারা আর কোনো কথা না বলে গন্তব্যস্থল থেকে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে পারুর মনে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল—যোবেদাকে কি সত্যিই এই বিয়ে থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে?আর যদি সম্ভব না হয়—তাহলে যোবেদার ভবিষ্যৎ কোন অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?চলবে...
0 Comments