পর্ব এক,,, ফিরে আসাঅর্ণব শহরে থাকত। চাকরি, ব্যস্ততা, রোজকার ছোটাছুটি সব মিলিয়ে গ্রামের বাড়িতে আসা প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। দাদু মারা যাওয়ার পর থেকে সে আর ফেরেনি। কিন্তু এবার একটু অন্যরকম কারণেই আসা। বাবার ফোন \"বাড়িটা বেচে দেব, তোরা সবাই তো থাকিস না।\"সেই ফোনের পর অর্ণব বুঝতে পারল, শেষবারের মতো হলেও ওই বাড়িতে যাওয়া দরকার। শনিবার সকালে সে ট্রেনে উঠল। জানালার পাশে বসে দেখল, ধানখেত, নদী, আর দূরের গ্রামগুলো সবই আগের মতোই আছে। শুধু সময় বদলেছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে ভেসে আসা বাতাসে ছিল সেই চেনা গন্ধ ভেজা মাটি, ধানক্ষেত, আর কুয়াশার মতো মিশে থাকা শৈশব।গ্রামের স্টেশনে নেমে সে দেখল, স্টেশনটা এখনো আগের মতোই আছে। ছোট্ট একটা দোকান, চায়ের কেটলি, আর বেঞ্চে বসে থাকা কয়েকটা চেনা মুখ। কেউ কেউ তাকে চিনতে পারল, \"অর্ণব না? কতদিন পর এলি রে।\" অর্ণব হাসল, কিছু বলল না।রিকশায় করে বাড়ির পথে যেতে যেতে সে দেখল, পাশের বাড়িটা ভেঙে ফেলা হয়েছে, সেখানে এখন নতুন একটা দোকান উঠেছে। শৈশবের সেই সবুজ মাঠটা আর নেই। কংক্রিটের দেয়াল উঠে গেছে। সময় কত দ্রুত বদলে যায়, সেটা অর্ণব আগে কখনো এভাবে অনুভব করেনি।বাড়িতে ঢুকতেই ধুলোর গন্ধ। দরজার কবাট ক্যাঁচ করে শব্দ করল। ভেতরে ঢুকে অর্ণব দেখল, আসবাবপত্র সব ঢেকে রাখা, দেয়ালে দাদুর ছবি সেই চিরচেনা হাসি। ছবিটার দিকে তাকিয়ে অর্ণবের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য ভারী হয়ে এলো।পর্ব দুই,,, কাঠের বাক্সদাদুর ঘরটা এখনো আগের মতোই। দেয়ালে পুরনো ক্যালেন্ডার, টেবিলে দাদুর চশমা, আর খাটের পাশে সেই পুরনো কাঠের আলমারিটা। আলমারির কোণে একটা পুরনো কাঠের বাক্স। অর্ণব কৌতূহল নিয়ে বাক্সটা খুলল। ভেতরে কিছু হলদে হয়ে আসা চিঠি, একটা পুরনো ঘড়ি, আর একটা ছোট ডায়েরি।চিঠিগুলো পড়তে শুরু করল সে। সবগুলোই দাদুর হাতে লেখা। কিন্তু কাউকে পাঠানো হয়নি। প্রথম চিঠিটা...\"প্রিয় রেণু,তুই চলে যাওয়ার পর থেকে এই ঘরটা আমার কাছে বড় ফাঁকা লাগে। তোকে বলতে পারিনি, তাই লিখে রাখলাম। আজ সন্ধ্যায় তোর বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলাম। দেখলাম, তুই বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলি। হাত নাড়াতে পারিনি। শুধু দূরে দাঁড়িয়ে দেখলাম।\"অর্ণবের হাত কাঁপতে শুরু করল। রেণু কে? দাদুর জীবনে এমন একটা নাম আছে, যা সে কখনো শোনেনি। চিঠিগুলো একটার পর একটা খুলে সে পড়তে থাকল। ধীরে ধীরে খুলে গেল এক অজানা গল্প।পর্ব তিন,,, দাদুর যৌবনদাদু যুবক ছিলেন তখন। নাম ছিল বিনোদ। বিনোদ ছিল গ্রামের স্কুলের মাস্টার শান্ত, চুপচাপ, বই পড়তে ভালোবাসত। আর রেণু ছিল পাশের গ্রামের মেয়ে। শ্বশুরবাড়ি থেকে আসা, হাসিখুশি, একটু দুষ্টু, আর গলায় মিষ্টি সুর।দুজনের দেখা হতো নদীর ঘাটে। রেণু পানি নিতে আসত, বিনোদ বই পড়তে বসত। প্রথম দিন কথা হয়নি, শুধু চোখাচোখি। দ্বিতীয় দিন বিনোদ সাহস করে জিজ্ঞেস করল, \"আপনার নাম কী?\" রেণু হেসে বলল, \"জানতে চান কেন।\" বিনোদ কিছু বলতে পারল না, শুধু মাথা নিচু করে হাসল।সেই থেকে শুরু। চা এর দোকানে, আবাসিক হোটেলের পাশে, বাজারের মোড়ে ছোট ছোট দেখা। কথা হতো কম, কিন্তু চোখের ভাষায় সব বলা হয়ে যেত।একদিন বিনোদ সাহস করে রেণুকে বলল, \"আপনাকে বিয়ে করতে চাই।\" রেণু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, \"বাবা রাজি হবেন না।\" বিনোদ বলল, \"আমি চেষ্টা করব।\"কিন্তু চেষ্টা কাজে লাগল না। রেণুর বাবা ছিলেন গ্রামের প্রভাবশালী মানুষ। তিনি মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেললেন অন্য এক ধনী পরিবারে। রেণু কেঁদেছিল, বিনোদও। কিন্তু কেউ কিছু করতে পারেনি। রেণুকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। তারপর থেকে বিনোদ সেই ভালোবাসা বুকে নিয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন, কাউকে কিছু না বলে।পর্ব চার,,, চিঠির পর চিঠিঅর্ণব ধীরে ধীরে সব চিঠি পড়ল। প্রতিটি চিঠিতে দাদুর জীবনের আলাদা আলাদা অধ্যায়।একটা চিঠিতে লেখা...\"রেণু,আজ তোর বিয়ের খবর পেলাম। সারারাত ঘুমাতে পারিনি। ভাবলাম, তুই সুখে থাকলেই আমি সুখী হব। কিন্তু সত্যি বলতে, এই কথাটা নিজের মনকে বোঝানো সহজ ছিল না।\"আরেকটা চিঠিতে...\"রেণু,আজ স্কুলে একটা ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করল, স্যার, ভালোবাসা কী? আমি বলতে পারলাম না। ভাবলাম, তুই থাকলে তুই বলে দিতি।\"আরেকটা চিঠিতে...\"রেণু,আমার বিয়ে হলো। মেয়েটা ভালো। কিন্তু তোকে ভুলতে পারিনি। ক্ষমা করিস।\"অর্ণবের চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। সে কখনো ভাবেনি, তার চুপচাপ, শান্ত দাদুর ভেতরে এত বড় একটা গল্প লুকিয়ে আছে।শেষ চিঠিটা ছিল অনেক বছর পরের...\"রেণু,আজ তোকে দেখলাম হাসপাতালের সামনে। তুই বুড়ি হয়ে গেছিস। আমিও। তবু চোখের কোণে আজও সেই মেয়েটাকে খুঁজে পেলাম। ভালো থাকিস।\"চিঠিটার শেষে কোনো তারিখ নেই, শুধু একটা আধা-লেখা লাইন \"আজ যদি তুই পাশে থাকতি...\"পর্ব পাঁচ,,, উত্তর খোঁজাঅর্ণব চিঠিগুলো গুছিয়ে রেখে বাবার কাছে গেল। বাবা তখন উঠানে বসে চা খাচ্ছিলেন। অর্ণব জিজ্ঞেস করল, \"বাবা, রেণু কে।বাবা চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, \"তুই কীভাবে জানলি?\"\"দাদুর চিঠি পেয়েছি।\"বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, \"রেণু ছিল তোমার দাদুর প্রথম ভালোবাসা। বিয়ে হয়নি। কিন্তু সারাজীবন ওকে ভুলতে পারেননি। তোমার দাদি জানতেন। তবু কিছু বলতেন না। সংসার ভাঙতে চাননি।\"অর্ণব অবাক হয়ে বলল, \"দাদি জানতেন?\"বাবা মাথা নাড়লেন। \"একবার দাদি নিজেই আমাকে বলেছিলেন, তোমার দাদুর বুকে একটা ঘর আছে, যেটা আমি কখনো দখল করতে পারিনি। কিন্তু আমি রাগ করিনি। কারণ তিনি সারা জীবন আমাদের জন্য যা করেছেন, সেটাই যথেষ্ট।\"অর্ণবের গলা ধরে এলো। সে বুঝল, দাদি ছিলেন আরও বড় মনের মানুষ। ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়, কখনো কখনো সহ্য করাও।পর্ব ছয়,,, না বেচার সিদ্ধান্তসন্ধ্যা নামছে। বাইরে পাখিরা ফিরে যাচ্ছে বাসায়। অর্ণব উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটা বেচার কথা ভুলে গেল সে। সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, এই বাড়ির দেয়ালগুলো একটা অসমাপ্ত গল্প লুকিয়ে রেখেছিল। যে গল্প কেউ কখনো জানতে পারেনি।সে চিঠিগুলো সযত্নে বাক্সে রেখে বাবার কাছে গেল। বলল, \"বাবা, বাড়িটা বেচে দেব না। এই বাড়িতে এমন কিছু আছে, যা দিয়ে কোনো টাকা কেনা যায় না।\"বাবা কিছু বলেননি। শুধু চোখটা একবার ছলছল করে উঠেছিল।অর্ণব বলল, \"আমি এই বাড়িটা ঠিক করব। দাদুর ঘরটা আগের মতো করে রাখব। চিঠিগুলো একটা আলমারিতে রেখে দেব। হয়তো কোনো একদিন কেউ এসে পড়বে, আর জানবে — এই বাড়িতে একদিন একটা বড় ভালোবাসার গল্প ছিল।\"বাবা হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল অনেক বছরের চাপা কষ্ট, আর অনেক দিন পরের শান্তি।পর্ব সাত,,, শেষ বিকেলঅর্ণব দাদুর ঘরে গিয়ে জানালা খুলে দিল। শেষ বিকেলের আলো ঘরে পড়ল। ধুলোর কণাগুলো আলোয় ঝলমল করে উঠল। সে বাক্সটা খুলে শেষ চিঠিটা হাতে নিল। তারপর নিজের ডায়েরিতে লিখল \"আজ আমি আমার দাদুকে চিনলাম। শুধু একজন দাদু হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে। যাঁর বুকে ছিল একটা অসমাপ্ত গল্প, যা কেউ কখনো পড়েনি। আজ থেকে আমি সেই গল্পের রক্ষক।\"সে চিঠিটা বাক্সে রেখে ঢাকনা বন্ধ করল। বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো নিভে আসছে। কিন্তু অর্ণবের মনে হলো, এটা কোনো শেষ নয়। বরং এটা একটা নতুন শুরু।কিছু ভালোবাসা বলা হয় না, শুধু বুকে লুকিয়ে রাখা হয়। কিছু গল্প শেষ হয় না, শুধু অপেক্ষা করে থাকে কেউ একজন পড়বে বলে। হয়তো দাদুর সেই চিঠিগুলোও তেমনই ছিল না পাঠানো, না বলা, তবু সারাজীবন বেঁচে থাকা।
একটা পুরনো কাঠের বাক্সের, ভেতরে হলদে হয়ে আসা কিছু চিঠি, আর একটা না বলা ভালোবাসার গল্প। দীর্ঘদিন পর নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে আসে অর্ণব। সে খুঁজে পায় তার দাদুর চিঠিগুলো, যেগুলো কখনো ডাক পায়নি। প্রতিটি চিঠি খুলে ধীরে ধীরে খুলে যায় এক অজানা অধ্যায় যেখানে ছিল ভালোবাসা, অপেক্ষা আর ক্ষমা। এই গল্প একজন দাদুর না বলা কথা, আর একজন নাতির খুঁজে পাওয়া উত্তর।
0 Comments